শুক্রবার দুপুরে বাবার সঙ্গে স্থানীয় বাজারে গিয়েছিল তিন শিশু। বাজারে গিয়ে মিষ্টি খেয়েছে, বাবার কাছ থেকে নতুন জামাকাপড় পেয়েছে। ফেরার পথে বাবা কিনে এনেছেন একটি মোরগ। রাতে সেই বাবা নিজের হাতে রান্না করে তিন সন্তানকে খাইয়েছেন ভাত। এরপরই বদলে যায় সবকিছু। অভিযোগ, পানি জাতীয় একটি পানীয়ের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তিন সন্তানকে তা পান করান শরাফত আলী। পরে নিজেও বিষপান করেন তিনি।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের রজনীলাইন গ্রামে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা। মারা গেছে শরাফত আলীর তিন সন্তান; মাওয়া আক্তার (৮), তামিম আহমদ (৫) ও শামিম আহমদ (২)। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শরাফত আলী বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালে ভাইয়ের পাশে আছেন শরাফত আলীর বড় ভাই মারফত আলী। একসঙ্গে আদর-স্নেহে বড় হতে থাকা তিন ভাতিজা-ভাতিজিকে হারানোর শোক যেন কিছুতেই সামলাতে পারছেন না তিনি। কথা বলতে বলতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।
মারফত আলী বলেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন শরাফত আলীর স্ত্রীর ফাতেমা বেগম। পরে তাদের ঘরে আরেকটি সন্তান জন্ম হয়। সম্প্রতি তার স্ত্রী আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্ত্রীকে বিদেশ পাঠানোর জন্য শরাফত নিজেই প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করেন।’
তিনি বলেন, ‘যাত্রার নির্ধারিত হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ আগে স্ত্রীকে বিদেশ না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন শরাফত। তবে স্ত্রী সেই নিষেধ না মেনে গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্বামী শরাফতকে না জানিয়ে সৌদি আরব চলে যান। এরপর থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। নিষেধ দেওয়ার পরও স্ত্রী প্রবাসে চলে যাওয়ায় বাড়ির সকলের ওপরও রাগ করেন তিনি।’
শুক্রবার দুপুরের পর তিন সন্তানকে নিয়ে বাজারে যাওয়ার ঘটনাটি এখন মারফত আলীর কাছে আরও বেশি কষ্টের স্মৃতি হয়ে উঠেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাজারে গিয়ে শরাফত সন্তানদের মিষ্টি খাওয়ান। নতুন জামাকাপড় কিনে দেন। ফেরার পথে একটি মোরগও কিনে বাড়ি ফেরেন।
রাতে নিজের হাতে রান্না করেন শরাফত। সেই রান্না করা ভাত তিন সন্তানকে খাওয়ান। এরপর পানি জাতীয় একটি কিছুর সঙ্গে বিষ মিশিয়ে সন্তানদের পান করানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সন্তানদের বিষপান করানোর পর শরাফত নিজেও বিষপান করেন।
রাত দুইটার দিকে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতর থেকে শিশুদের কান্নার শব্দ শুনতে পান জানিয়ে মারফত আলী বলেন, ‘অন্য ঘর থেকে শিশুদের দাদি ও চাচারা আসেন। তখন দরজা ভেঙে সবাইকে ছটফট করতে দেখা যায়।’
তিনি বলেন, ‘৮ বছর বয়সী বড় ভাতিজিকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় সবাইকে জোর করে শরবত খাওয়ানোর পর থেকে ব্যথা শুরু হয়। এরপর তাদের অবস্থা বেগতিক দেখে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ঘর থেকে বের করা হয়। কিন্তু মাহারাম নদী পার হওয়ার জন্য কোনো নৌকা পাওয়া যায়নি।’
হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদে তখন পরিবারের সদস্যরা চারজনকে নিয়ে বাদাঘাট এলাকায় একজন চিকিৎসকের বাড়িতে যান। চিকিৎসক তাদের হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে আবার বাড়িতে ফিরে আসেন তারা। ভোরে মোটরসাইকেল দিয়ে একজন নৌকার মাঝিকে নিয়ে আসা হয়। এরপর নদী পার হয়ে তিন শিশু ও তাদের বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তাহিরপুর উপজেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফৌজিয়া বলেন, সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে তিন শিশু ও তাদের বাবাকে উপজেলা হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দেখা যায়, হাসপাতালে আনার আগেই তিন শিশুই মারা গেছে। বাবা শরাফত আলীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শরাফত আলীরা সাত ভাই ও পাঁচ বোন।
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ বলেন, তিন শিশুর মরদেহ বর্তমানে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহগুলো সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে। শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, কীভাবে তাদের বিষপান করানো হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে বাবার সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।