শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
বিনোদন

আজ সালমান শাহর ৫৫তম জন্মদিন

ইমন থেকে সালমান শাহ: এক কিংবদন্তির গল্প

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে সিলেট নগরের দাড়িয়াপাড়ার নানাবাড়ি আব এ হায়াত ভবনে জন্ম নেয় এক শিশু। নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। তখন কেউ জানত না, এই শিশুই একদিন বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় হয়ে উঠবেন সালমান শাহ—একটি প্রজন্মের স্বপ্নের নায়ক।

আজ তার ৫৫তম জন্মদিন। ১৯ সেপ্টেম্বর এলেই তাই শুধু একজন চলচ্চিত্র অভিনেতার জন্মদিন মনে পড়ে না; ফিরে আসে নব্বইয়ের দশকের সেই সময়, যখন রুপালি পর্দায় এক তরুণের উপস্থিতি বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের মধ্যে তৈরি করেছিল নতুন উন্মাদনা।

সিলেটের দাড়িয়াপাড়ার সেই বাড়ি এখনো সালমান শাহর জন্মস্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। জন্মনাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। বাবা কমর উদ্দীন চৌধুরী, মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন তিনি। শৈশব-কৈশোরের একটি অংশ কাটে খুলনায়। পরে ঢাকায় পড়াশোনা করেন। ছোটবেলা থেকেই গান, অভিনয় ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তার আগ্রহ।

পর্দায় তার প্রথম পরিচয় অবশ্য চলচ্চিত্র দিয়ে নয়। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র একটি মিউজিক ভিডিওতে মডেল হিসেবে দেখা যায় তাকে। এরপর বিজ্ঞাপনচিত্র ও টেলিভিশন নাটকে কাজ করেন। ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠেন দর্শকের কাছে।

তবে তার ক্যারিয়ারের বড় মোড় আসে ১৯৯৩ সালে। সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহর। একই ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে মৌসুমী ও গায়ক আগুনের। ছবিটি মুক্তির পর সালমান শাহকে ঘিরে যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়, তা অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত তারকায় পরিণত করে।

এরপর যেন ছুটে চলা। ‘সুজন সখি’, ‘কন্যাদান’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘আনন্দ অশ্রু’সহ একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মতো চলচ্চিত্রজীবনে ২৭টি ছবিতে অভিনয় করেন সালমান শাহ।

তার অভিনীত চলচ্চিত্রে ছিল গল্প ও চরিত্রের বৈচিত্র্য—রোমান্স, পারিবারিক গল্প, সামাজিক বাস্তবতা, কমেডি, অ্যাকশন থেকে ট্র্যাজেডি। অভিনয়ের পাশাপাশি তার পোশাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ধরন ও ব্যক্তিত্বও নব্বইয়ের দশকের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ফলে তিনি শুধু চলচ্চিত্রের নায়ক ছিলেন না; হয়ে উঠেছিলেন একটি সময়ের তারুণ্যের প্রতীক।

কিন্তু সেই পথচলা দীর্ঘ হয়নি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা যান সালমান শাহ। তার মৃত্যুকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়। সরকারি তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় সামনে এসেছে। অন্যদিকে তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছে। ২০২৬ সালেও বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফলে মৃত্যুর কারণের প্রসঙ্গে দীর্ঘদিনের তদন্ত, আদালত-সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া এবং পরিবারের দাবিকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও সালমান শাহর জনপ্রিয়তায় যেন ভাটা পড়েনি। তার অভিনীত চলচ্চিত্র এখনো দর্শকের আলোচনায় আসে। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের মধ্যেও তার চলচ্চিত্র, অভিনয় ও ফ্যাশন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।

কারণ সালমান শাহর সময়টা ছিল অল্প, কিন্তু সেই অল্প সময়েই তিনি তৈরি করে গেছেন নিজস্ব এক পরিচয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাই তার নামটি আলাদা করে স্মরণ করা হয়।

দাড়িয়াপাড়ার নানাবাড়িতে জন্ম নেওয়া সেই ইমন আজ নেই। নেই নতুন কোনো ছবিতে তাকে দেখার অপেক্ষা, নেই নতুন কোনো চরিত্রে তার অভিনয় দেখার সুযোগ। কিন্তু পর্দায় রেখে যাওয়া চরিত্রগুলো রয়ে গেছে। রয়ে গেছে তার গান, সংলাপ, পোশাকের ধরন, অভিনয়ের স্মৃতি এবং তাকে ঘিরে দর্শকের ভালোবাসা।

১৯ সেপ্টেম্বর তাই সালমান শাহর জন্য শুধু জন্মদিন নয়; ফিরে দেখারও একটি দিন। একজন তরুণ কীভাবে মাত্র কয়েক বছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন, সেই গল্প মনে করার দিন।

দাড়িয়াপাড়ার ইমন থেকে সালমান শাহ—নামটি থেমে গেছে বহু বছর আগে, কিন্তু দর্শকের স্মৃতিতে সেই যাত্রার পর্দা এখনো নামেনি।

এই সম্পর্কিত আরো