মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়া, একদিন পর ঢাকায় আবার গ্রেপ্তার নিষিদ্ধ আ.লীগ হাজী স্বপন

সুনামগঞ্জের ছাতকে জনতার হাতে আটক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা হাজী স্বপন মিয়াকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠার একদিন পর রাজধানী ঢাকা থেকে তাকে আবার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে রাজধানীর বনানী এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। পরে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে ছাতক পৌর শহরের তাহির প্লাজার সামনে স্থানীয় জনতা হাজী স্বপন মিয়াকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পরে পুলিশ হেফাজতে তাকে চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল থেকেই রাতের কোনো একসময় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হাজী স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের শারপিন নগর গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে। বর্তমানে তিনি ছাতক পৌর শহরের মণ্ডলীভোগ এলাকায় বসবাস করেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে ঢাকার বনানী এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ছাতক থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলাটি ২২ জুলাই ২০২৫ তারিখে দায়ের করা হয় এবং এতে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(৩)/২৫-ডি ধারার উল্লেখ রয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) হাজী স্বপন মিয়াকে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানা থেকে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।


হাজী স্বপনকে ঘিরে অভিযোগ ও পুলিশি অনুসন্ধানের বিষয়টি নতুন নয়। বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের নির্দেশে ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের স্মারক নং—অপঃ/২৫/৩১৬৫/ভি, তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৫-এর সূত্রে অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য ছাতক সার্কেল কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ৭২ নম্বর স্মারক জারি করা হয়।

ওই স্মারকে অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী ও হাজী স্বপন মিয়াকে ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১টায় ছাতক সার্কেল কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ছাতক থানার তৎকালীন ওসিকে অনুরোধ করা হয়। নথিতে হাজী স্বপনের পরিচয় হিসেবে পিতা মৃত আব্দুল মান্নান, গ্রাম—শারপিন নগর (বর্তমানে মণ্ডলীভোগ), থানা—ছাতক, জেলা—সুনামগঞ্জ উল্লেখ রয়েছে।

তবে ওই অনুসন্ধানের পর অভিযোগের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের পর স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের কেউ কেউ ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের প্রত্যাহারের দাবিও জানান।

উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাকী বিল্লাহ অভিযোগ করেন, অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ছাতক পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন সুমেনও হাজী স্বপনকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি থানার ওসির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ছাতক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তানিমুল ইসলাম তানিম, যুবদল নেতা আব্দুল মোমেন মামনুন ও নোমান ইমদাদ কাননসহ কয়েকজন নেতাও হাজী স্বপনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তার সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে হাজী স্বপনের বিভিন্ন ব্যবসা ও সরকারি উন্নয়নকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও জানা গেছে। তবে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, ঘুষ বা আর্থিক লেনদেন এবং তার ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাবসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে ছাতক থানার ওসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাজী স্বপন মিয়ার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

এদিকে হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের প্রতিবাদে সোমবার সন্ধ্যায় ছাতক শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে ওই কর্মসূচিতে ওসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের প্রত্যাহারের দাবি জানানোর কথা বলা হয়।

এর মধ্যেই সোমবার রাতে ঢাকায় হাজী স্বপনের পুনরায় গ্রেপ্তারের খবর আসে। ফলে ছাতকে তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকায় পুনরায় গ্রেপ্তারের ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এই সম্পর্কিত আরো