বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

সিলেটে ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিং

সিলেট বিভাগে সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে লোডশেডিং। শহর এলাকায় ঘণ্টা দেড় ঘণ্টা পর বিদ্যুতের দেখা মিললেও গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ অবস্থা। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

নগরীর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে। বিভাগের কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম ভোগান্তি ও দুর্ভোগে পড়েছেন এসএসসি পরীক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্করা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতাল, এসএসসি পরীক্ষার্থী, বয়স্করা আছেন বিপাকে। মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। দিনের শেষভাগে ব্যবসা শুরুর আগেই বন্ধ করতে হচ্ছে তাদের প্রতিষ্ঠান। ২০২৬ সালে শুরু হওয়া এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের দূর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছে। তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে উদ্বেগে আছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত কোনো সময়সূচি ছাড়াই গত কয়েকদিন ধরে সিলেট অঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র শিল্প ও দোকানপাট, বিদ্যুৎনির্ভর দোকানপাট, ফ্রিজ, কোল্ড স্টোরেজ ও উৎপাদন ও বেচাকেনায় প্রভাব পড়ছে।এ ছাড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রেস্তোরাঁ, কফিশপ, ফাস্টফুডসহ বিভিন্ন খাবার দোকানের ব্যবসায়ীরা।

বিদ্যুৎ সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগের পিডিবি অঞ্চলে বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ২০৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে ১৭৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে নিয়মিত লোডশেডিং করা হচ্ছে। এই ঘাটতির প্রভাবে দিনে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রতিটি ফিডারে পর্যায়ক্রমে এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হচ্ছে। রাত ১২টার পর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও দিনের বেলায় সংকট তীব্র থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হবিগঞ্জের বিবিয়ানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকা, জ্বালানি সংকট এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সব মিলিয়ে সিলেট বিভাগজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন।

সিলেট নগরীর পাঠানঠুললা এলাকার বাসিন্দা ও এসএসসি পরীক্ষার্থীর অভিবাক নিকলেস পাল কালবেলাকে বলেন, দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছি, আমার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী। প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। তবে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায় যা এসএসসি শিক্ষার্থী তার মেয়ের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

সিলেট নগরীর লামাবাজারের বাসিন্দা ও এসএসসি পরীক্ষার্থী সোমা বেগম কালবেলাকে বলেন, পরীক্ষার আগমুহূর্তে রিভিশন দেওয়ার সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ১০-১১ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। পরীক্ষা চলাকালীন সময় জরুরি ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সুনামগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোশনূর বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দোকানপাট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্ধ রাখা হয়, কোথাও অতিরিক্ত আলোকসজ্জাও করা হয় না। তারপরও এমন বিদ্যুৎ সংকট অগ্রহণযোগ্য। এদিকে এসএসসি পরীক্ষার সময়েও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে না পারায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ।

হবিগঞ্জ শহরের শ্যামলি এলাকার বাসিন্দা এনাম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, তাদের এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। দিনে ও রাতে মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে। এতে করে এসএসসি পরিক্ষার্থীসহ শিশুদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

হবিগঞ্জ রাজনগর এলকার বাসিন্দা ও এসএসসি পরিক্ষার্থীর অভিভাবক হাফিজুর রহমান তালুকদার কালবেলাকে বলেন, বিদ্যুতের এই ভেলকিবাজিতে তার বাসায় পরীক্ষা দেওয়া তার এক আত্মীয় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ ছাড়া লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায়ীরাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিদ্যুৎনির্ভর দোকানপাট, ফ্রিজ, কোল্ড স্টোরেজ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় পণ্যের ক্ষতি হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সময়ের আগেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হচ্ছে।

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ

সিলেটে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন থেকেই বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পরীক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সকাল থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় রিভিশন ও প্রস্তুতিতে সমস্যা হয়েছে। আবার পরীক্ষার হলেও গরমে কষ্ট পোহাতে হয়েছে। অভিভাবকরাও জানিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সন্তানদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং ফলাফলে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুড ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ না থাকায় আগেভাগেই বন্ধ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ও বেচাকেনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সাধারণ মানুষও চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—দিনে-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন কালবেলাকে বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে এসএসসি পরীক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে, জ্বালানি সংকটে অনেক জেনারেটর বন্ধ রয়েছে। জিন্দাবাজার ও আল হামরা এলাকার মতো ব্যস্ত এলাকায় মানুষ রাস্তায় অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকায় তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকলেও সিলেটে কেন এত লোডশেডিং হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও পিডিবি থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং টিম গঠন ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণ খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি। একইসঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী হোসাইন মোহাম্মদ সাব্বির কালবেলাকে বলেন, একেক দিন বিদ্যুৎতের চাহিদা একেক রকম থাকে। গড়ে ১৪-১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎতের প্রয়োজন হয়। দিনে লোডশেডিং খুব একটা করতে হয় না। তবে রাতে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৬৫ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। চাহিদা ১১ থেকে ১২ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৫ মেগাওয়াট। ফলে লোড ম্যানেজমেন্টের জন্য ঘনঘন লোডশেডিং করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, পিডিবির দিরাই জোনে দৈনিক চাহিদা ৬ থেকে সাড়ে ৬ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ২ থেকে আড়াই মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেটের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশিক জুলকার নাঈম কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে দিনে প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে যেখানে ২৪ ঘণ্টায় ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার কথা, সেখানে এখন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত সাধারণত লোডশেডিং থাকে না। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। তবে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। বাজার এলাকায় চাহিদা বেড়ে গেলে লোডশেডিং আরও বৃদ্ধি পায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সিলেট জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহাদাত আলী বলেন, সমস্যাটা শুধু সিলেটের না এটি বৈশ্বিক সমস্যা। সরকার চেষ্টা করছে দ্রুতই এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের। তবে তার আগে পর্যন্ত জাতীয় গ্রিড থেকে আমাদের ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোড দেওয়া হয় এবং সেটিকেই রেশনিং আকারে আমরা সরবরাহ করছি।

তিনি আরও বলেন, সিলেটে সব জায়গায় এই মুহূর্তে বিদ্যুতের উন্নয়ন সম্ভব নয় তাই অনেক জায়গায় আমাদের বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হবে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন কালবেলাকে বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে এবং চাহিদা কম থাকলে তা তুলে নেওয়া হয়।

তিনি জানান, আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, কেবল বিতরণ করে থাকি। পাওয়ার গ্রিড পিজিসিবি থেকে পাওয়া বরাদ্দ অনুযায়ী সিলেটসহ চার জেলায় বিদ্যুৎ বণ্টন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ পেলে শতভাগ সরবরাহ সম্ভব। বর্তমানে ২০৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৭৫ মেগাওয়াট সরবরাহ থাকায় প্রায় ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

এই সম্পর্কিত আরো