সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত এখন আর কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি যেন অবৈধ বাণিজ্যের এক অভয়ারণ্য। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির তোয়াক্কা না করে এখানে দিন-রাত সমানতালে চলছে ভারতীয় গরু-মহিষ, চিনি, জিরা, কসমেটিকস ও মাদকের অবাধ প্রবেশ। এই চোরাচালান বাণিজ্যের লাগাম টানতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, জৈন্তাপুর সীমান্তের প্রতিটি সংবেদনশীল পয়েন্টে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী ‘লাইনম্যান’ চক্র। এই চক্রটি মূলত চোরাচালানের নিরাপদ করিডোর হিসেবে কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি চালান নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, এই অবৈধ অর্থের বড় একটি অংশ পৌঁছায় জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লার কাছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত টাকা না দিলে সীমান্ত পথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় চোরাকারবারিদের।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চোরাচালান রোধে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমি কাজ করছি, আমি রোবট নই; আমারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।
এছাড়া তিনি বলেন, কয়দিন আগে একজন সাংবাদিক আমার ছবি দিয়ে আমাকে ফেসবুকে চাঁদাবাজ লিখেছে। তো কী হয়েছে?
হরিপুর চেকপোস্ট দিয়ে নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রাক যাতায়াত করলেও নজরদারি নিয়ে থেকে যাচ্ছে বড় প্রশ্ন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লা দাবি করেন, গরু-মহিষের কাগজপত্র যাচাই করেই ছাড়া হয়। তবে একই পথে পার হওয়া অন্যান্য অবৈধ পণ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কৌশলে তা এড়িয়ে যান।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে ওসি নিজেই বক্তব্য না দিয়ে তাঁর পাশে বসে থাকা এক ব্যক্তির হাতে ফোন ধরিয়ে দেন। নিজেকে স্থানীয় একটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি সরকারি থানায় কেন উপস্থিত এবং ওসির পক্ষে সাফাই গাইছেন—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি। সরকারি কর্মকর্তার প্রশাসনিক চেয়ারে বসে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ওসির পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, এখন আর রাতের অন্ধকার নয়, দিনের আলোতেই সীমান্ত দিয়ে খালাস করা হচ্ছে চোরাই পণ্য। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, অন্যদিকে মাদকের সহজলভ্যতায় ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে স্থানীয় যুবসমাজ। আইনশৃঙ্খলার এই চরম অবনতিতে জৈন্তাপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি যদি কেবল খাতাপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সীমান্ত এলাকার এই অরাজকতা থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, অবিলম্বে জৈন্তাপুরের চোরাচালান পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হোক। একইসঙ্গে, পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
পর্ব-১