মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের হেলাপুর, হিংগাজিয়া, গাজীপুর, পলকোনাসহ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের একটি অংশ আব্দুল মান্নান লাল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জমি দখল, চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ, হুমকি ও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগকারীরা জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তারা এসব কারণে ভোগান্তিতে রয়েছেন। আব্দুল মান্নান লাল হেলাপুর গ্রামের মো. হাবিজ মিয়ার ছেলে। ২০০৬ সালে মাঠপর্যায়ে ভূমি জরিপ শুরুর পর থেকে তিনি এলাকায় বিভিন্ন বিরোধে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আব্দুল মান্নান কয়েকজনের সঙ্গে মিলে সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানি এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধে জড়ানোর পাশাপাশি অর্থ আদায় করেছেন। পূর্ব হেলাপুর জামে মসজিদের প্রায় পাঁচ শতক জমি দখল এবং মসজিদের নিলামকৃত বাঁশ কাটা নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি আদালতে মামলা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
গত ৬ আগস্ট রাতে হেলাপুর গ্রামের পারভেজ মিয়ার বাড়ি নির্মাণের কাজ বন্ধ করে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে আব্দুল মান্নান লাল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পারভেজ মিয়া পরবর্তীতে আদালতে চাঁদাবাজি ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন।
আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষে এস এম নজরুল ইসলাম, আজমল হোসেন, ফজলুর রহমান, কুতুব উদ্দিন চৌধুরী, পারভেজ উজ্জামান, ফারুক আহমদ, মাসুক মিয়াসহ প্রায় ৩০ জনের স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ গত ২০ আগস্ট মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া হয়। পরে গত ১২ সেপ্টেম্বর সংসদ সদস্য মো. শওকতুল ইসলাম বরাবরও অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগটি আমলে নিয়ে তিনি কুলাউড়া থানার ওসিকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগকারীরা জানান।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, আব্দুল মান্নান বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে হিংগাজিয়া গ্রামের সোনা মিয়ার ২০ হাজার, আবুল মিয়ার প্রবাসী আত্মীয়ের ৩০ হাজার, কটারকোনা গ্রামের সোহাগ মিয়ার দুই লাখ, হিংগাজিয়া-গাজীপুরের সিতাব মিয়ার দুই লাখ, হেলাপুরের আজমল মিয়ার ৮২ হাজার, পারভেজ মিয়ার ৪৫ হাজার এবং প্রবাসী আবু জাফরের তিন লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অন্যদিকে, আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার পর গত এক মাসে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালত ও থানায় একাধিক মামলা ও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা। গত ৭ সেপ্টেম্বর ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মৌলভীবাজার আদালতে একটি মামলা এবং মসজিদের জমির বাঁশ কাটাকে কেন্দ্র করে কুলাউড়া থানায় আরও তিনটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর তদন্ত করছেন থানার এসআই আফসার ভূঁইয়া ও তোফায়েল আহমদ।
সর্বশেষ গত ১৬ সেপ্টেম্বর এলাকার ব্যবসায়ী কুতুব উদ্দিন চৌধুরী তাজকে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে কুলাউড়া আদালতে সিআর মামলা করা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। কুতুব উদ্দিন চৌধুরীর দাবি, তাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, ফজলুর রহমান, লেবু মিয়া ও কুতুব উদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মামলা ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের ভয়ে অনেকে আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সাহস পাননি। সম্প্রতি কয়েকটি মামলা ও অভিযোগের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মান্নান লাল বলেন, মানুষের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয়। মসজিদের জমি নিয়ে তার মামলা রয়েছে। সম্প্রতি এলাকার লোকজন তার বাড়িতে হামলা করায় তিনি মামলা করেছেন। তবে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি রাজি আছেন।
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, এলাকার বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মামলা ও অভিযোগ চলমান রয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।