দেশজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি আর তীব্র লোডশেডিংয়ে এমনিতেই নাকাল সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য। বিক্রি তলানিতে ঠেকায় বছরজুড়ে চড়া দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন এবং সরকারি কর-ভ্যাট পরিশোধ করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এমন এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে নগরীর শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে ‘সৃজনশীল পণ্য প্রদর্শনী মেলা’র উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের মাঝে নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই আয়োজনকে নিজেদের ‘অস্তিত্বের ওপর চরম আঘাত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মেলা বন্ধের দাবিতে একাট্টা হয়েছেন সিলেটের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ও চেম্বার নেতৃবৃন্দ।
সিলেটের ব্যবসায়ী মহলের দাবি স্পষ্ট—বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের খুচরা, ইনডোর বা স্থানীয় বিচ্ছিন্ন মেলার অনুমতি দেওয়া যাবে না। প্রচলিত বাণিজ্য নীতিমালা অনুসরণ করে প্রয়োজনে বছরে মাত্র একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা যৌথভাবে হতে পারে। অনতিবিলম্বে শাহী ঈদগাহের মেলা বন্ধ না হলে আগামী তিন দিন পর ধর্মঘটসহ রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, স্থায়ী ব্যবসায়ীরা বছরজুড়ে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও লাখো মানুষের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখেছেন। অথচ মেলা উপলক্ষে বাইরে থেকে আসা মৌসুমি বিক্রেতারা কোনো ধরনের স্থায়ী পরিচালন খরচ ছাড়াই অল্প কয়েক দিনের জন্য ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে যান। এতে স্থানীয় বাজারব্যবস্থায় এক অসম ও অন্যায্য প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়।
এর ওপর যোগ হয়েছে সিলেটের সাম্প্রতিক তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতি। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে যখন দোকানপাট ও শিল্পকারখানা সচল রাখাই দায় হয়ে পড়েছে, তখন মেলা আয়োজনের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার রাতে নগরীর বারুতখানাস্থ একটি হোটেলের হলরুমে জরুরি যৌথ সভায় মিলিত হন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা এবং সিলেট জেলা ও মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের নেতৃবৃন্দ।
দোকান মালিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও সিলেট জেলা ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় জানান, ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই বাণিজ্যের বিরোধী নন। তবে ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে বারবার বিচ্ছিন্ন মেলা আয়োজন স্থানীয় বাণিজ্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। বক্তারা দাবি জানান—সিলেট চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বার ও উইমেন চেম্বারের সমন্বয়ে বছরে সর্বোচ্চ একটি আন্তর্জাতিক মেলা হতে পারে, কিন্তু পৃথক মেলার নামে এমন স্বেচ্ছাচারিতা আর বরদাশত করা হবে না।
এ বিষয়ে আগামী রোববার সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে মেলা বন্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ না এলে দোকানপাট বন্ধ রেখে ধর্মঘটের মতো সর্বাত্মক কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন ব্যবসায়ী নেতারা। সংকট উত্তরণে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরেরও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ও উপস্থিত ছিলেন মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুল মল্লিক মুন্না, দোকান মালিক সমিতি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল আহাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক নিয়াজ মোহাম্মদ আজিজুল করিম, মো. শফিকুল করিম, মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাদি পাভেল এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট ও বাজার সমিতির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
এদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এই দাবির প্রতি জোরালো একাত্মতা প্রকাশ করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এসএমসিসিআই)। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি খায়রুল হোসেন জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক সংকট ও বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সংকটকালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ছাড়া অন্য কোনো স্থানীয় কিংবা ইনডোর মেলার অনুমতি দেওয়া সমীচীন হবে না।
এসএমসিসিআই মনে করে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু স্থানীয় বাজারের সক্ষমতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যত্রতত্র মেলা বসানো হলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই সার্বিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চেম্বার।
একদিকে ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠে মেলার আয়োজন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অসন্তোষ, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জীবিকা ও অস্তিত্বের লড়াই—সব মিলিয়ে সিলেটের বাণিজ্যিক অঙ্গনে এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ী সমাজের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসন শাহী ঈদগাহ মাঠের বিতর্কিত মেলা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো নগরী।