মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
প্রবাস

স্ত্রীর মৃত্যু: অস্ট্রেলিয়ায় গ্রেপ্তার স্বামী

বাংলাদেশে স্ত্রী রেহানা পারভীনের মৃত্যুর তদন্ত প্রভাবিত করতে ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁর স্বামী আওলাদ হোসেন (৫১)। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) বলছে, বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে স্ত্রী হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলা থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়া এবং তদন্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন আওলাদ।

মঙ্গলবার কুইন্সল্যান্ড থেকে আওলাদকে গ্রেপ্তার করে এএফপি। তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

এএফপি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে একাধিকবার অর্থ পাঠিয়েছেন আওলাদ। সব মিলিয়ে এর পরিমাণ ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি। এর একটি অংশ বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে এএফপি।

তবে এএফপির কমান্ডার স্টিফেন জে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কোনো সরকারি বা পুলিশ কর্মকর্তা ওই অর্থ গ্রহণ করেছেন কিংবা অর্থের বিনিময়ে তদন্তে প্রভাব পড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। রেহানার মৃত্যুর তদন্তে বাংলাদেশ পুলিশের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ায় চলমান তদন্তের সূত্র ধরেই ঘুষের অভিযোগটি সামনে আসে। মঙ্গলবার কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইন্সের দুটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করেন তদন্তকারীরা। একই সময়ে সিডনি ও ব্রিসবেনের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ও ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করা হয়।

এএফপি জানিয়েছে, ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে আদালতে নেওয়া এটি সংস্থাটির প্রথম মামলা।

আওলাদ বর্তমানে ব্রিসবেনে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে তাঁর মামলা আদালতে উঠলেও শুনানি মুলতবি করা হয়েছে। বুধবার তাঁর জামিনের আবেদন করার কথা রয়েছে।


রেহানার মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় পৃথক তদন্ত চলছে। বাংলাদেশ পুলিশ এরই মধ্যে আওলাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। অন্যদিকে এএফপি রেহানার মৃত্যুকে সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে। অস্ট্রেলীয় তদন্তকারীরা এর আগে বাংলাদেশে গিয়ে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে কাজ করেছেন।

আওলাদের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় আরও একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগ, রেহানার মৃত্যু সনদ জাল করে তাঁদের যৌথ মালিকানাধীন কুইন্সল্যান্ডের তিনটি সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে আওলাদের আইনজীবী আদালতে দাবি করেছেন, মৃত্যু সনদটি জাল নয়। মামলাটি ব্রিসবেন জেলা আদালতে বিচারাধীন।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক রেহানা স্বামী আওলাদ হোসেন ও তাঁদের পাঁচ সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছিলেন। ২০২৪ সালের ৬ জুন কিশোরী মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে যান রেহানা। সেখানে তিনি বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি ও অন্যান্য স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করেন। তাঁর স্বামী আওলাদ ২৯ জুন বাংলাদেশে যান।

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ জুলাই থেকে রেহানার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাঁর মা আইরিন আক্তার ৩১ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। একই সময়ে এএফপি ও ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের পক্ষ থেকেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরে রেহানা সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়।

৮ সেপ্টেম্বর রেহানার মা বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় অপহরণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে রেহানাকে অপহরণের অভিযোগ আনা হয়। তাঁদের মধ্যে আওলাদও ছিলেন। তদন্তে পরে আরও একজনের নাম যুক্ত হয়।

মামলার তদন্তে রেহানার ননদ পাপিয়া আক্তার ও আমজাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১২ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নয়াহাট-মৌনদিয়া চৌরাপাড়া এলাকায় পাপিয়ার বাড়ির আঙিনা থেকে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটির নিচে মরদেহটি পুঁতে রাখা হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়।

বাংলাদেশে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা নুর খান পরে অস্ট্রেলিয়ার এবিসিকে জানান, পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী ৫ জুলাই রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে পাপিয়ার বাড়িতে রেহানাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। প্রাথমিক তদন্তে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে হত্যার বিষয়টি সামনে আসার পাশাপাশি ওই সময় আওলাদ বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন বলেও তদন্তে উঠে আসে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জুন বাংলাদেশে গিয়ে ১৩ জুলাই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান আওলাদ।

২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, রেহানাকে হত্যা ও মরদেহ গুমের ঘটনায় তাঁর স্বামী আওলাদের যোগসাজশ ছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। রেহানার মা আইরিন আক্তারও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে আওলাদ ও তাঁর স্বজনদের বিরুদ্ধে মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ করেন। পরে আদালত বাংলাদেশে আওলাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশে চলমান মামলার বিষয়টি চলতি বছরের মে মাসে ব্রিসবেনের একটি আদালতকেও জানানো হয়। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বাইরে কোনো অস্ট্রেলীয় নাগরিক বা বাসিন্দার মৃত্যুর ঘটনায় প্রযোজ্য দেশটির ফেডারেল আইনের আওতায় রেহানার মৃত্যু নিয়ে তদন্ত শুরু করে এএফপি।

সেই তদন্তের সূত্র ধরেই এবার বাংলাদেশে ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ পাঠিয়ে তদন্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ সামনে এসেছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার কুইন্সল্যান্ড থেকে আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই সম্পর্কিত আরো