ছেলে কি বিদেশে থাকে? বিয়ের আলোচনার শুরুতেই এখন এই প্রশ্নটি প্রায় অবধারিত। প্রবাসী পাত্রের প্রতি এই অতিরিক্ত আগ্রহ সিলেটের বিয়ের বাজারে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রত্যাশা অনেক সময় পরিণত হচ্ছে চাপ, বিভ্রান্তি ও প্রতারণার ঝুঁকিতে।
যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা বা মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত পাত্রদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অনেক পরিবার বিশ্বাস করে, প্রবাসী পাত্র মানেই মেয়ের জন্য নিরাপদ ও স্বচ্ছল ভবিষ্যৎ। তবে এই ধারণার সুযোগ নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য গোপন বা ভ্রান্ত তথ্য দেওয়ার অভিযোগও বাড়ছে।
নগরীর উপশহর এলাকার এক ভুক্তভোগী নারী (ছদ্মনাম)রাবেয়া আক্তার জানান, বিয়ের আগে তার স্বামী নিজেকে ইতালিতে স্থায়ীভাবে কর্মরত বলে পরিচয় দেন। কিন্তু বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, তার কোনো স্থায়ী কাজ নেই; অস্থায়ীভাবে বিদেশে গিয়ে আবার দেশে ফিরে এসেছেন। “শুরুতে তার কথাবার্তা ও উপস্থাপনায় আমরা বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম, কিন্তু পরে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন দেখা যায়,বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন-এতে শুধু মানসিক নয়, আমার পরিবার আর্থিকভাবেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সালমা সুলতানা জানান- তার বিয়ের বয়স দুই বছর পেরিয়েছে। বিয়ের সময় লন্ডনপ্রবাসী স্বামী তাকে অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
তিনি বলেন-শুরুর দিকে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা কমে গেছে। কখন, কীভাবে আমাকে লন্ডনে নেওয়া হবে—এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেন না।
তিনি আরও বলেন-পরিবারের পক্ষ থেকেও বারবার বিষয়টি জানার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো উত্তর মেলেনি। এতে করে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ দিন দিন বাড়ছে।
দক্ষিণ সুরমা এলাকার বাসিন্দা সাম্মি আক্তার জানান, তিনি সিলেটের একটি অভিজাত শপিংমলে চাকরি করতেন। সেখানেই এক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় পরিবারের সম্মতিতেই প্রবাসীর সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।
তিনি বলেন-শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই তার কথাবার্তা ও আচরণে অসংগতি চোখে পড়তে থাকে।
প্রায় দুই বছর পর তিনি নিশ্চিত হন, যুক্তরাষ্ট্রে তার স্বামীর আরেকটি স্ত্রী ও আলাদা সংসার রয়েছে। আমাদের সঙ্গে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। সত্যটা জানার পর আমি ও আমার পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি বলেন তিনি।
এ বিষয়ে সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুর রহমান বলেন-বিয়ে সংক্রান্ত প্রতারণার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও সামাজিক সম্মানহানি এবং পারিবারিক মান-মর্যাদার কথা চিন্তা করে অনেক পরিবার শেষ পর্যন্ত আইনি পদক্ষেপ নিতে চায় না। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর এই অনীহার সুযোগ নিয়েই প্রতারক চক্র বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে, যা তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন করে তোলে।
তিনি বলেন-তবে পুলিশ সবসময়ই এই বিষয়ে তৎপর। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আমরা দ্রুততম সময়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আমার অনুরোধ থাকবে—কেউ প্রতারণার শিকার হলে লজ্জা না পেয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ দ্রুত থানায় অভিযোগ করুন। আপনারা তথ্য দিলে এবং অভিযোগ করলে আমরা সহজেই এসব প্রতারককে আইনের আওতায় আনতে পারব।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাহমিনা ইসলাম বলেন- সিলেটের প্রবাসীনির্ভর সামাজিক কাঠামোর কারণে বিয়ের ক্ষেত্রে ‘বিদেশ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে পাত্রের ব্যক্তিগত ও বাস্তব অবস্থান যথাযথভাবে যাচাই করেন না।
তিনি আরও বলেন-এই প্রবণতা একদিকে যেমন সামাজিক চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতির কারণে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। তাই বিয়ের আগে পাত্রের কর্মসংস্থান, ভিসার অবস্থা এবং পারিবারিক তথ্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন-বিয়ে সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, প্রতারণা বা সম্পর্কের জটিলতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা থেকে উদ্বেগ, হতাশা এমনকি বিষণ্নতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন-এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের মানসিক সহায়তা পাওয়া জরুরি। পরিবারকে সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত, যাতে তারা মানসিকভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন।
এ বিষয়ে ব্লাস্ট এর সিলেট শাখার সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সত্যজিৎ কুমার দাস বলেন - বিয়ে সংক্রান্ত প্রতারণার ক্ষেত্রে অনেক নারীই আইনি সহায়তা নিতে দেরি করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশেষ করে প্রবাসী পাত্রের ক্ষেত্রে তথ্য গোপন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হলে তা প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন-বিয়ের আগে পাত্রের বৈবাহিক অবস্থা, কর্মসংস্থান ও বসবাসের বৈধতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে লিখিত চুক্তি, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রওশন আরা মুকুল বলেন-প্রবাসী পাত্রকে ঘিরে অতিরিক্ত আগ্রহ অনেক সময় পরিবারগুলোকে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন-বিয়ের আগে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করা, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা না থাকা এবং সামাজিক চাপে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ—দু’পক্ষকেই আরও সচেতন হতে হবে এবং নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।