সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে ঘনঘন বিদ্যুৎ লোডশেডিং ও অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে অনেক গ্রাহকের হাতে আসছে অস্বাভাবিক ও ‘ভুতুড়ে’ বিলের কাগজ। এতে গ্রাহকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ।
সরেজমিনে জানা গেছে, শান্তিগঞ্জ উপজেলার আটটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। সব মিলিয়ে অনেক এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, মাতৃদুগ্ধদানকারী মা ও অসুস্থ রোগীরা।
ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায়ও ব্যাঘাত ঘটছে। প্রচণ্ড গরমে দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষেরাও পড়েছেন দুর্ভোগে। বিদ্যুতের অভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা সময়মতো গাড়ির ব্যাটারি চার্জ দিতে পারছেন না।
উপজেলার বিভিন্ন বড় বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানপাটে ফ্যান চলছে না। প্রচণ্ড গরমে ব্যবসায়ীরা যেমন স্বস্তিতে বসতে পারছেন না, তেমনি ক্রেতাদের উপস্থিতিও কমে গেছে। ফলে বেচাকেনায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে স-মিল, রাইস মিল, মসলা মিল ও কয়েল লাকড়ির মিলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষের ঘুমেও মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগী চিকিৎসাধীন থাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদেরও চরম কষ্ট পোহাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হঠাৎ কয়েকগুণ বেশি বিল এসেছে তাদের। এতে অনেকেই বিল পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
শান্তিগঞ্জের বীরগাঁও গ্রামের গণমাধ্যমকর্মী উসমান গণি বলেন, ‘আমার বাড়িতে একটি ফ্যান ও দুটি লাইট ব্যবহার করি। সবসময় আমার বিদ্যুৎ বিল এক হাজার টাকার মধ্যে থাকে। কিন্তু এবার সেই বিলই ছয় হাজার টাকা দিয়ে পরিশোধ করেছি। এমন বিল আমার কখনো আসেনি। আমরা এ থেকে পরিত্রাণ চাই।’
জয়কলস গ্রামের অটোরিকশাচালক সামসুল হক বলেন, ‘লোডশেডিং তো আছেই। ঘরে অসুস্থ স্ত্রী, ছোট ছোট বাচ্চা। এই গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া কীভাবে চলা যায়? এক কথায় জীবন যায় যায় অবস্থা। আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ কখন যায় আর কখন আসে, সেটাই বুঝতে পারি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত বিল আসছে। আমি দুটি লাইট, একটি ফ্যান ও একটি পানির মোটর ব্যবহার করি। আগে প্রতি মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বিল দিতাম। কিন্তু এবার সবকিছু ছাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা বিল এসেছে। আমি গরিব মানুষ, এত টাকা বিল কীভাবে দেব? হঠাৎ করে বিল এত বেশি আসার কারণ কী, এর সুরাহা চাই।’
এদিকে, লোডশেডিংয়ের বিষয়ে শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাব-জোনাল অফিসের এজিএম রাসেল আহমদ বলেন, জ্বালানি সংকট, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘পুরো উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট। কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র ২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গত দুই দিনের তীব্র তাপদাহে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিদ্যুতের ঘাটতি সমন্বয়ের চেষ্টা করছি।’
তবে ‘ভুতুড়ে’ ও অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, এমন কোথায়ও হচ্ছে না। আর যদি হয়ে থাকে এই নির্দিষ্ট গ্রহককে অফিসে এসে অভিযোগ করতে হবে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, এই সমস্যা পুরো দেশজুড়ে। এটা একটা ন্যাশনাল ক্রাইসিস। দেশের দুইটা পাওয়ার প্লান্টের উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে চলতেছে একটা হলো পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর আরেকটা হলো আদানি থেকে যেটা আসে। সরকারের দিক নির্দেশনা হলো মানুষকে সৌর বিদ্যুৎ এর দিকে ধাবিত হতে হবে।