সিলেটে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আয়োজনকে কেন্দ্র করে সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও 'তুঘলকি কাণ্ড'-এর অভিযোগ উঠেছে। মেলা পরিচালনা ও ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানে অস্বচ্ছতা এবং রাতের আঁধারে গোপনে পছন্দের পাত্রকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চক্রান্ত ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইভেন্ট আয়োজক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগের তীর সরাসরি সংগঠনটির সভাপতি লুবানা ইয়াসমিন শম্পার দিকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলা এই নেত্রীর বিরুদ্ধে আড়ালে গোপন বৈঠক ও কোটি কোটি টাকার মেলা বাণিজ্য নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টার তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৬ সালের মেলা আয়োজনের জন্য সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স আনুষ্ঠানিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে। এতে মেলা পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করে সিলেটের অন্তত ৫টি প্রতিষ্ঠিত ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান চেম্বার কর্তৃপক্ষের কাছে নির্ধারিত নিয়মে আবেদন জমা দেয়। কিন্তু দরপত্র জমা নেওয়ার পর থেকেই মেলা পরিচালনা নিয়ে চেম্বারের পক্ষ থেকে শুরু হয় 'তেলেসমাতি'।
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের চরম বিস্ফোরণ ঘটে আজ, ১৪ সেপ্টেম্বর (সোমবার)। এদিন হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মেলার অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্বোধনের একটি ব্যানার ছড়িয়ে পড়ে। ব্যানারে লেখা রয়েছে—“সিলেট বাণিজ্য মেলা ২০২৬-এর অবকাঠামো উন্নয়নের শুভ উদ্বোধন। স্থান: শাহী ঈদগাহ মাঠ। আয়োজনে: সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে: সিলভপন্ট প্লানার্স।”
টেন্ডারের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়ে কিংবা অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে না জানিয়েই আজ শাহী ঈদগাহ মাঠে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণা আসায় হতবাক আবেদনকারী ইভেন্ট আয়োজকরা।
ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি নিজেদের পছন্দমতো বা গোপনে মেলা পরিচালনার চুক্তিই করে ফেলা হয়, তবে কেন আমাদের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হলো? এটি সুস্পষ্ট প্রতারণা ও সময় নষ্ট করার নামান্তর।
এদিকে জানা গেছে, কোটি কোটি টাকার বাজেট নিয়ে আয়োজিত এই মেলা কোনো তৃতীয় পক্ষের ইভেন্ট সংস্থাকে সরাসরি না দিয়ে কৌশলে চেম্বার কর্তৃপক্ষ নিজেরাই পরিচালনা করতে চাইছে। আর অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে যে ‘সিলভেন্ট প্ল্যানার্স’-এর নাম এসেছে, তারাও দরপত্রে অংশ নিয়েছিল বলে সূত্রে জানা যায়। টেন্ডারে অংশ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ না করেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়ায় লুবানা শম্পার গোপন কৌশল ও অসাধু আঁতাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের।
এ ঘটনায় মেলা আয়োজক মহলে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রতারণামূলক এই দরপত্র প্রক্রিয়ার সঠিক তদন্ত এবং মেলা আয়োজনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ ও প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানসমূহ।
উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃপক্ষের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেত্রীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সিলেট শাহী ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত মেলাটি বাস্তবায়ন করবে সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি। আর মেলার ইভেন্টের জন্য কারো সাথে কোন চুক্তি হয়নি। মেলা আযোজনের বিষয়ে পূর্বের দরপত্রের আয়োজকদের কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সদুত্তর দেননি।
এদিকে নগরীর ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহ মাঠে এই মেলা আয়োজনের উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখা। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) মেলা বন্ধের দাবি জানিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবর আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি প্রদান করেছে সংগঠনটি।
স্মারকলিপিতে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন অনুমোদনের আগেই মেলাটি একটি বহিরাগত বাণিজ্যিক সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে, যার ফলে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তারা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে স্কুল-কলেজের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। জনবহুল শাহী ঈদগাহ এলাকায় মেলা বসলে তীব্র যানজট ও মাইকিংয়ের শব্দে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং পড়ালেখার পরিবেশ মারাত্মক বিঘ্নিত হবে, ঈদগাহ সংলগ্ন সড়কগুলো এমনিতেই ব্যস্ততম। মেলা শুরু হলে নগরজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি ট্রাফিক জট তৈরি হবে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ ফেলবে এবং পরপর একাধিক মেলা আয়োজনের কারণে মহানগরের স্থায়ী ও খুচরা মার্কেটগুলোর সাধারণ ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন।
এছাড়া, ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ মাঠটি স্থানীয় শিশু-কিশোর ও তরুণদের অন্যতম খেলার মাঠ হিসেবে পরিচিত। খেলাধুলার এই পরিসর মেলা আয়োজনের নামে আটকে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেটের ক্রীড়ামোদী ও অভিভাবক সমাজ।
পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা গুরুতর অভিযোগ, দরপত্রে অস্বচ্ছতা এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবানা ইয়াসমিন শম্পার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
প্রতারণামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু তদন্ত, মেলা বাণিজ্যের নেপথ্যের কারিগরদের জবাবদিহি এবং নগরীর নাগরিক শান্তি বজায় রাখতে অবিলম্বে সিলেটের জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগী ইভেন্ট আয়োজকেরা। অন্যথায় রাজপথে নামার পাশাপাশি আইনি লড়াইয়েরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।