‘প্রতিদিন কত খবর আসে কাগজের পাতা ভরে, জীবন খাতায় অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে’—কবির এই পঙ্ক্তির মতোই সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের বৃদ্ধ করম আলীর জীবনের গল্প যেন আড়ালেই থেকে গেছে।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে সরকারি রাস্তার পাশে একটি ঝুপড়ি ঘরে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ৭০ বছর বয়সী করম আলী। বাঁশের খুঁটির ওপর মাচাং তৈরি করে পলিথিনের বেড়া ও ছাউনি দিয়ে বানানো সেই অস্থায়ী আশ্রয়েই কাটছে তার দিন-রাত। নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, নেই কোনো স্যানিটেশন সুবিধা।
একসময় গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিভিন্ন মালামাল বিক্রি করে সংসার চালাতেন করম আলী। কিন্তু বয়সের ভার ও নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় কয়েক বছর ধরে তিনি কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। ফলে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুনকে। তিনি বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে চুড়ি বিক্রি করে যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে চলছে তাদের জীবন।
অর্থাভাবে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না করম আলী। সংসারে উপার্জনের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় দিন দিন বেড়েছে তাদের দুর্ভোগ।
বৃহস্পতিবার করম আলী বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই ঝুপড়ি ঘরেই আছি। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। ছেলেরা আলাদা সংসার করে, মেয়ের স্বামী দিনমজুর। তারা খোঁজখবর নেয়, কিন্তু আর্থিক সহযোগিতা করার সামর্থ্য নেই। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশেই বসবাস করছি।’
তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘স্বামী কোনো কাজ করতে পারেন না। তাই আমাকেই গ্রামে গ্রামে গিয়ে চুড়ি বিক্রি করতে হয়। যা আয় করি, তা দিয়েই সংসার চালাই। অসুস্থতার কারণে কোনো দিন কাজে যেতে না পারলে ধারদেনা করে চলতে হয়। শুনেছি সরকার গৃহহীনদের ঘর দেয়, কিন্তু আমরা কোথায় গেলে সেই সহযোগিতা পাবো জানি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি রাস্তার পাশে অত্যন্ত কষ্টে বসবাস করছে। ঝড়-বৃষ্টি হলে ঝুপড়ি ঘরের ভেতর পানি ঢুকে সবকিছু ভিজে যায়। পরে রোদে শুকিয়ে আবার ব্যবহার করতে হয়। তিনি বলেন, ‘সরকার কিংবা কোনো বিত্তবান ব্যক্তি যদি তাদের একটি বসবাসযোগ্য ঘরের ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে তারা একটু স্বস্তিতে জীবন কাটাতে পারতেন।’
এ বিষয়ে সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘করম আলীকে সরকারিভাবে ১২ শতক জায়গা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তবে জায়গাটি নিচু হওয়ায় বর্ষাকালে সেখানে পানি জমে যায়। আর অর্থাভাবে তিনি ঘর নির্মাণ করতে পারেননি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তাকে একটি ঘর ও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা প্রদানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’
দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করা এই বৃদ্ধ দম্পতির জন্য মানবিক সহায়তা ও একটি নিরাপদ আশ্রয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।