আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিদেশ থেকে মঞ্জুর হওয়া স্টুডেন্ট-ডিপেনডেন্ট ভিসার বড় একটি অংশ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের নাগরিকেরা পেয়ে থাকেন। গত অর্থবছরে নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের মোট ১০ হাজার ৪৪৮টি স্টুডেন্ট-ডিপেনডেন্ট ভিসা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদেশ থেকে মঞ্জুর হওয়া এ ধরনের ভিসার ৭০ শতাংশের বেশি পেয়েছেন এই পাঁচ দেশের নাগরিকেরা।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বৃহস্পতিবার ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে তাঁদের স্টুডেন্ট ভিসার সঙ্গে স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানকে যুক্ত করার সুযোগ পাবেন না। তবে পিএইচডিসহ নির্দিষ্ট কিছু কোর্স এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও আসিয়ানভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকবে।
বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য না হওয়ায় দেশভিত্তিক এই ছাড় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে পিএইচডিসহ ব্যতিক্রমের আওতায় থাকা নির্দিষ্ট কোর্সে অধ্যয়নরত যোগ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম প্রয়োগ করা হবে না। টনি বার্ক জানিয়েছেন, যেসব শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্য ইতিমধ্যে তাঁদের ভিসার আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন প্রযোজ্য হবে না।
ভিজিটর ভিসার ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আনার পরিকল্পনা করছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। ভবিষ্যতে সাধারণভাবে ভিজিটর ভিসায় ‘নো ফারদার স্টে’ শর্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ভিজিটর ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে দেশটির ভেতর থেকে অন্য ভিসার আবেদন করে ব্রিজিং ভিসার মাধ্যমে অবস্থান দীর্ঘ করার সুযোগ সীমিত হবে।
তবে দক্ষ কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আনার সুযোগ বহাল থাকবে। টনি বার্ক জানান, অস্ট্রেলিয়ায় আসা চিকিৎসক ও নির্মাণকর্মীদের প্রায় অর্ধেক এবং নার্স ও এজড কেয়ার কর্মীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে আসেন। প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী আকৃষ্ট করার স্বার্থে তাঁদের পরিবারের ওপর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মতো বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে না।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃহত্তর অভিবাসন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। চলতি অর্থবছরে নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং আগামী অর্থবছরে তা ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
এদিকে সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছে দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত। ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউড বলেন, তিন থেকে চার বছরের জন্য বিদেশে পড়তে আসা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে জীবনসঙ্গীকে সঙ্গে রাখার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এই সুযোগ সীমিত হলে অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হারাতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অস্ট্রেলিয়ায় মাস্টার্সে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, একজন বিবাহিত শিক্ষার্থীর জন্য কয়েক বছর পরিবার থেকে আলাদা থাকা সহজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি পরিবারকে সঙ্গে রাখা যাবে কি না, বিদেশে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্তে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি অন্য দেশের সুযোগও বিবেচনা করতে পারেন।
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউ সাউথ ওয়েলস ইনক.-এর সভাপতি জায়েদুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে অনেক পরিবার সন্তানকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে। নতুন নিয়মে কারা প্রভাবিত হবেন এবং কারা ব্যতিক্রমের সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
সিডনিভিত্তিক স্কিলওয়েব গ্লোবালের পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা বাংলাদেশিদের ওপর এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে। অনেক শিক্ষার্থী স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নেওয়ার পরিকল্পনা করেই অস্ট্রেলিয়াকে বেছে নেন। সেই সুযোগ সীমিত হলে তাঁদের কেউ কেউ অন্য দেশের কথা বিবেচনা করতে পারেন। তবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসায় আবেদন করার সুযোগ থাকছে।
শুধু পরিবারের সদস্যদের ভিসার ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কোর্স পরিবর্তনের নিয়মেও কড়াকড়ি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কোর্স পরিবর্তন করতে হলে নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে হবে।
একটি কোর্স শেষ করে পরবর্তী কোর্সে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটি উচ্চতর যোগ্যতার স্তরের হতে হবে। যেমন, ব্যাচেলর শেষ করে মাস্টার্সে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক শিক্ষাগত অগ্রগতিতে বাধা থাকবে না। মূলত একই বা নিম্ন পর্যায়ের কোর্সে বারবার ভর্তি হয়ে স্টুডেন্ট ভিসার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘ করার প্রবণতা বন্ধ করাই এই পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন নীতিতে বাংলাদেশিদের অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় আসার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে না। তবে পরিবারসহ উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ম আরও কঠোর হচ্ছে। পাশাপাশি ভিজিটর ভিসা ও ভিসা পরিবর্তনের মাধ্যমে অবস্থান দীর্ঘ করার সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে ও বাইরে থাকা নতুন আবেদনকারীদের পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।