শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
হবিগঞ্জে ডেপুটি স্পিকার - ১৫-১৭ বছরের ময়লা চাইলেই সরানো সম্ভব না, সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিপুল ভোটে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল বিজয়ী ছাতকে ১০৪ গ্রাম পুলিশের মধ্যে বাইসাইকেল, পোশাক ও সরঞ্জাম বিতরণ ধর্মপাশায় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখায় ৫ হাজার, অবৈধ প্রেসক্রিপশনে ২০ হাজার টাকা জরিমানা ধর্মপাশায় সরকারি মাদ্রাসা যেন ধান রাখার গোডাউন! ওসমানীনগরে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি সিলেট ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ, আহত ২ দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী আকবরের ফাঁসি দ্রুত কার্যকরের দাবি রায়হানের মায়ের শ্রীমঙ্গলে সাবানা বেগম হত্যা: ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড, দুইজনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা
advertisement
সিলেট বিভাগ

কারাম উৎসব

নেচে-গেয়ে নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য ও শেকড়ের গল্প বললেন চা শ্রমিক আদিবাসীরা

চা বাগানের সবুজে ঘেরা জনপদ। চারদিকে উৎসবের আমেজ। মাঠজুড়ে মানুষের ঢল। কারও পরনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কারও হাতে বাদ্যযন্ত্র। ঢোলের তালে তালে এগিয়ে চলছে নৃত্য। কখনো গান, কখনো লোককথা, আবার কখনো ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ছন্দে মুখর পুরো পরিবেশ। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের শেকড়ের গল্প যেন সেদিন নতুন করে বলছিলেন চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ।

এভাবেই ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দঘন পরিবেশে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নালুয়া চা বাগানে অনুষ্ঠিত হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব কারাম পূজা। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী নালুয়া চা বাগানের ফুটবল খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে সমবেত হন কয়েক হাজার মানুষ। আয়োজকদের হিসাবে, উৎসবে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।

কারাম উৎসব যেন শুধু পূজা-অর্চনার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল চা বাগানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মিলন, আনন্দ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার এক বিশাল আয়োজন।

নালুয়া চা বাগান আদিবাসীবৃন্দের আয়োজনে এবং বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সার্বিক সহযোগিতায় আয়োজিত এ উৎসবে সিলেট, মৌলভীবাজার, সাতগাঁও, সুরমা, দেউন্দী, লালচান্দ, চান্দপুর, চণ্ডিছড়া, চাকলা, আমু ও নালুয়া চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগান থেকে সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।

ওরাঁও, মুন্ডা, ঝরা, খাড়িয়া, বাড়াইক, তাঁতী, কর্মকার, ভূমিজ, তুরিয়া, মহালী ও সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ১৪ থেকে ১৫টি নৃত্য ও সাংস্কৃতিক দল উৎসবে অংশগ্রহণ করে। একের পর এক দল মঞ্চে উঠে নাচ ও গান পরিবেশন করে। তাদের পরিবেশনায় ফুটে ওঠে নিজস্ব ভাষা, লোকজ ঐতিহ্য, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির নানা রং।

ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারামের গল্প

কারাম মূলত একটি গাছকে কেন্দ্র করে পালিত ধর্মীয় উৎসব। আদিবাসী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম গাছ পবিত্রতার প্রতীক। একই সঙ্গে এটি মঙ্গল, কল্যাণ ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

কারাম পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই ভাই ধর্মা ও কর্মার কাহিনি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ধর্মা ধর্ম ও ন্যায়নীতির পথে চলায় নানা বিপদ থেকে রক্ষা পান। অন্যদিকে কর্মা ধর্মীয় বিধান ও নীতি অনুসরণ না করায় ক্ষতির মুখে পড়েন। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে সৎপথে চলা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ন্যায়নীতির প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা তুলে ধরা হয়।

উৎসবের সময় কারামডাল অস্থায়ী মণ্ডপে স্থাপন করা হয়। এরপর চলে পূজা-অর্চনা, নাচ-গান ও কিচ্ছা বলার আয়োজন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এসব আচার-অনুষ্ঠানই কারাম উৎসবকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

উৎসব শেষে পরদিন কারামডাল উঠিয়ে নেওয়ার রীতি রয়েছে। এ সময় গ্রামের তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ নেচে-গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পরে পুকুরে কারামডাল বিসর্জন দেন।

চা বাগানের শ্রমজীবী মানুষের কাছে তাই কারাম উৎসবের অপেক্ষা শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় এলেই যেন বদলে যায় বাগানের চেনা পরিবেশ। কর্মব্যস্ত জীবনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উৎসবটি হয়ে ওঠে আনন্দ ভাগাভাগি করার একটি বিশেষ উপলক্ষ।

নাচে-গানে ফুটে উঠল বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি

নালুয়া চা বাগানের ফুটবল মাঠে অনুষ্ঠিত উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বিভিন্ন চা বাগান থেকে আসা দলগুলো তাদের নিজস্ব ঢংয়ে নৃত্য ও গান পরিবেশন করে।

কেউ তুলে ধরেছেন নিজেদের সম্প্রদায়ের লোকজ কাহিনি, কেউ নৃত্যের ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছেন গ্রামীণ জীবনের চিত্র। আবার কোনো দলের পরিবেশনায় উঠে এসেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোকসংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ।

দর্শকরাও এসব পরিবেশনা উপভোগ করেন প্রাণভরে। মাঠজুড়ে ছিল করতালি আর উচ্ছ্বাস। একের পর এক সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনায় উৎসবের মাঠ পরিণত হয় বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক মিলনমেলায়।

অতিথিদের উপস্থিতিতে উৎসবে বাড়ে প্রাণচাঞ্চল্য

নালুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু হরেন্দ্র উরাঁও, আমুরোড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক রামেশ্বর ভৌমিক ও দেবরাম মুন্ডার যৌথ সঞ্চালনায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নালুয়া চা বাগানের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রতন মুন্ডা।

দ্বিতীয় অধিবেশনে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন আকাশ মুন্ডা ও জয়দেব ভৌমিক। সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন ডুলনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রবীর ঝরা, নিপেন মুন্ডা এবং নালুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দুর্জয় তাঁতী।

নেচে-গেয়ে কারাম উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গোপনীয় শাখা ও জেএম শাখার সহকারী কমিশনার পৃথ্বীন্দ্র চাকমা, চুনারুঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌফিক আনোয়ার, আহম্মদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন পলাশ, নালুয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক তারিফ আহমেদ, সহকারী ব্যবস্থাপক অরূপ চাকমা, সাব্বির আহমেদ, আব্দুর রউফ, আসফাক নাসের তৌকির, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক নৃপেন পাল, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুন আক্তার এবং সিলেট মহানগর হাসপাতালের পরিচালক মাসুদ আহমেদ।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন দেবদাস উরাং, কপিল উরাং, নটবর রুদ্রপাল, মাখন গোস্বামী, বিপন মুন্ডা, গ্রাম আদালত প্রকল্পের মদন পাহান, মো. দুলু আহমেদ, স্কুলশিক্ষক কমল ভৌমিজ, মতি তাঁতী, নুরজিৎ তাঁতীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও ২ নম্বর আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের সম্মাননা, সাংস্কৃতিক দলকে পুরস্কার

উৎসবের শেষ পর্বেও ছিল বিশেষ আয়োজন। রাতে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায় উৎসাহ ও আনন্দ।

পরে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। কারাম উৎসব উদযাপন কমিটি ও সিলেট মহানগর হাসপাতালের পরিচালক মাসুদ আহমেদের পক্ষ থেকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

প্রথম স্থান অধিকারী সাংস্কৃতিক দলকে দেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্থান অধিকারী দলকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অধিকারী দলকে ৪ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক সাংস্কৃতিক দলকে ৩ হাজার টাকা করে পুরস্কৃত করা হয়।

সবশেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য রতন মুন্ডা আগত অতিথি, বিভিন্ন চা বাগান থেকে আসা সাংস্কৃতিক দল, আয়োজক এবং দর্শনার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী কারাম উৎসব।

সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার প্রত্যয়

চা বাগানের শ্রমজীবী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য কারাম পূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি তাদের অস্তিত্ব, শেকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহ্য।

প্রতিবছর এই উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস, লোককথা, নৃত্য, গান ও জীবনধারা। আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রত্যয় যেন প্রতিফলিত হয় কারামের প্রতিটি আয়োজনে।

নালুয়া চা বাগানের মাঠে তাই সেদিন শুধু একটি পূজা অনুষ্ঠিত হয়নি—নাচ, গান আর লোকজ ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে মানুষের শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক। কয়েক হাজার মানুষের মিলনমেলায় কারাম হয়ে উঠেছিল সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত উৎসব।

▐ এই সম্পর্কিত আরো

হবিগঞ্জে ডেপুটি স্পিকার১৫-১৭ বছরের ময়লা চাইলেই সরানো সম্ভব না, সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিপুল ভোটে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল বিজয়ী

ছাতকে ১০৪ গ্রাম পুলিশের মধ্যে বাইসাইকেল, পোশাক ও সরঞ্জাম বিতরণ

ধর্মপাশায় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখায় ৫ হাজার, অবৈধ প্রেসক্রিপশনে ২০ হাজার টাকা জরিমানা

ধর্মপাশায় সরকারি মাদ্রাসা যেন ধান রাখার গোডাউন!

ওসমানীনগরে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি

সিলেট ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ, আহত ২

দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী

আকবরের ফাঁসি দ্রুত কার্যকরের দাবি রায়হানের মায়ের

শ্রীমঙ্গলে সাবানা বেগম হত্যা: ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড, দুইজনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা