শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

মানবিক পুলিশিংয়ের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ওসি মনিরুজ্জামান

সিলেটের সীমান্তবর্তী ও প্রকৃতিকন্যা জাফলংখ্যাত পর্যটন সমৃদ্ধ জনপদ গোয়াইনঘাট উপজেলা। আয়তনে মেহেরপুর জেলার সমান বিশাল এই উপজেলাটি ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দুর্গমতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এখানে সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। 

১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই জনপদের মানুষের জীবন একসময় বালি ও পাথর উত্তোলনের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞায় সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। কর্মসংস্থানের সংকটে একসময় চোরাচালানের দিকে ঝুঁকে পড়ে বিশাল এক জনগোষ্ঠী। তবে সময়ের আবর্তে আর সুযোগ্য নেতৃত্বের ছোঁয়ায় সেই অন্ধকার অলিগলি পেরিয়ে গোয়াইনঘাট এখন এক শান্ত ও সুশৃঙ্খল জনপদে পরিণত হয়েছে। আর এই ইতিবাচক পরিবর্তনের অগ্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন গোয়াইনঘাট থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোয়াইনঘাটের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেশ কিছু রদবদল আসে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রথমে মো. হারুনুর রশীদ হারুন ওসি হিসেবে যোগ দিলেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে দ্রুত বিদায় নিতে হয়। এরপর আসেন তোফায়েল সরকার, যিনি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি করেন। পরবর্তীতে বিতর্কিত সাবেক ওসি আব্দুল আহাদের বদলি নিয়ে জনমনে অসন্তোষ দেখা দিলে হাল ধরেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গোয়াইনঘাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে।

দায়িত্ব নিয়েই ওসি মনিরুজ্জামান ঘোষণা করেন ‘জিরো টলারেন্স’। বালি ও পাথর পাচারকারী এবং সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। তার অদম্য সাহসিকতায় সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারীদের আধিপত্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করেছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।

গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নে সংঘটিত একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন মনিরুজ্জামানের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য। ঘটনার মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনি আশফাক ও তার ভাই মুস্তাকিম আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই তড়িৎ পদক্ষেপ স্থানীয় জনমনে পুলিশের প্রতি হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।


জাফলংয়ের প্রকৃতিকন্যা রূপ রক্ষায় তিনি পাথরখেকোদের বিরুদ্ধে দিনরাত অভিযান পরিচালনা করছেন। যুব সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে তার নিয়মিত অভিযান প্রশংসিত হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং ভারতীয় পণ্য চোরাচালান রোধে তিনি এখন চোরাকারবারীদের কাছে এক মূর্তমান আতঙ্ক। শুধু বাইরেই নয়, পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষাতেও তিনি কঠোর। কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধে জড়ালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে তিনি নজির সৃষ্টি করেছেন।

এর আগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) হালিশহর থানায় সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা গোয়াইনঘাটে এসে নিজেকে প্রমাণ করেছেন ‘জনগণের সেবক’ হিসেবে। তার অফিসের দরজা এবং ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে।


নিজের কর্মদর্শন সম্পর্কে ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে গোয়াইনঘাটবাসীর সহায়তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি। আমার কাছে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ নেই। যেখানেই আইন লঙ্ঘন হবে, সেখানেই অ্যাকশন নেওয়া হবে। অপরাধীর পরিচয় শুধুই অপরাধী, কোনো দল বা গোষ্ঠী বিবেচনায় তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমার লক্ষ্য গোয়াইনঘাটে একটি স্থায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা।

বালি-পাথর ও চোরাচালানের দুর্নাম ঘুচিয়ে গোয়াইনঘাট আজ ওসির বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এক নতুন দিনের পথে হাঁটছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ওসি মনিরুজ্জামানের মতো সৎ ও নির্ভীক অফিসার থাকলে সীমান্ত জনপদগুলোতে অপরাধের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকবে না।

এই সম্পর্কিত আরো