সীমান্তবর্তী উপজেলা জৈন্তাপুরে এখন মরণ নেশায় পরিণত হয়েছে ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেল। গত কয়েকদিন ধরে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা বাইকের সহজলভ্যতা এবং নামমাত্র দামে সেগুলো কিশোরদের হাতে পৌঁছে যাওয়ায় এলাকায় বাড়ছে বেপরোয়া গতি আর দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। গত কয়েক দিনে বেপরোয়া গতিতে বাইক চালাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে বেশ কয়েকজন কিশোর ও যুবক, যা এখন স্থানীয় অভিভাবকদের জন্য এক আতঙ্কের নাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জৈন্তাপুরের শ্রীপুর, ছৈলাখেল ও রাংপানি সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মোটরসাইকেল অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে। চোরাই পথে আসায় এসব বাইক শোরুমের তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। বিআরটিএ-র নিবন্ধনহীন এই বাইকগুলো মাত্র ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মধ্যে পেয়ে যাচ্ছে কিশোররা। বড় কোনো কাগজপত্রের ঝামেলা না থাকায় এবং নজরদারি কম থাকায় উঠতি বয়সী ছেলেদের হাতে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই ‘স্পিড মেশিন’।
চোরাই বাইকের সহজলভ্যতা কেবল অপরাধ বাড়াচ্ছে না, কেড়ে নিচ্ছে প্রাণও। গত কয়েকদিনে জৈন্তাপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কিশোর নিহতের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
গত কয়েক দিনে জৈন্তাপুর সংলগ্ন সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এবং বিপরীতমুখী যানের সঙ্গে সংঘর্ষে একাধিক কিশোরের প্রাণহানি ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এসব কিশোরদের কারোরই ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না এবং তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে ঘণ্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার গতিতে বাইক চালাচ্ছিল।
এসব মোটরসাইকেল চালকদের অধিকাংশেরই মাথায় থাকে না হেলমেট। চোরাই বাইক হওয়ায় পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তারা মহাসড়কের চেয়ে গ্রামের ভেতরের সরু রাস্তায় বেশি দ্রুতগতিতে চালায়, যার ফলে পথচারীরাও থাকছেন চরম ঝুঁকিতে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সন্তানদের হাতে অল্প বয়সে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া এবং তাদের আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তোলাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দ্রুত বড়লোক হওয়ার নেশায় সীমান্তের অন্ধকার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া এসব কিশোররা প্রথম আয়েই কিনছে এই 'মরণঘাতী' বাইক।
জৈন্তাপুরের একজন স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আক্ষেপ করে বলেন, "আগে ছেলেরা সীমান্তে যেতো পেটের দায়ে, এখন যায় শখ মেটাতে। কম টাকায় ভারতীয় বাইক পেয়ে তারা পাগল হয়ে রাস্তায় নামে, আর বাড়ি ফেরে লাশ হয়ে।"
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, সীমান্তে টহল জোরদারের পাশাপাশি অবৈধ ও কাগজপত্রবিহীন মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক জটিলতা এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জৈন্তাপুরের সাধারণ মানুষের দাবি, আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়ার আগেই সীমান্তে মোটরসাইকেল চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং মহাসড়কে বেপরোয়া বাইক চালকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।