সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

কোম্পানীগঞ্জে মাদকের ‘ওপেন মার্কেট’

১০০ কারবারির তালিকায় কাঁপছে সীমান্ত জনপদ!

সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ কোম্পানীগঞ্জে মাদক এখন ফেরিওয়ালার বাদামের মতো সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও হাত বাড়ালেই মিলছে গাঁজা, মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ ভয়ংকর সব মাদকদ্রব্য। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষ এই মরণনেশায় আক্রান্ত হলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণরা। সম্প্রতি ‘সবুজ সিলেট’ টিমের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উপজেলার ১০০ জন সক্রিয় মাদক কারবারির একটি চাঞ্চল্যকর তালিকা বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগের মতো লুকিয়ে নয়, বরং এখন প্রকাশ্যেই চলছে মাদকের কেনাবেচা। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে উপজেলার বর্নী, গৌরিনগর, খাগাইল, টুকের বাজার, বউবাজার ও পাড়ুয়া মহাসড়ক এলাকা মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। সিলেট শহর থেকে আসা শত শত মাদকসেবী এখান থেকে সংগ্রহ করে তাদের চাহিদা অনুযায়ী মাদক। এমনকি উপজেলার বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘উৎমা ছড়া’-তে দিনেদুপুরে পর্যটকদের হাতে মাদক তুলে দেওয়ার একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।


‘সবুজ সিলেট’ টিমের হাতে আসা তালিকায় দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এলাকার ভিত্তিতে কারবারিদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

বর্নী, গৌরিনগর ও খাগাইল এলাকা (২৪ জন): এই মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকার মূল হোতা হিসেবে রয়েছেন— তাজ উদ্দিন, শেখ উদ্দিন, সামসুল, জসীম, জিয়া, দুলালসহ অন্তত ২৪ জন।

বউ বাজার ও টুকের বাজার এলাকা (১৩ জন): এখানে সক্রিয় রয়েছেন হাশিম, কাদির, রুবেল, রহিম, রিফাতসহ ১৩ জন কারবারি।

পাড়ুয়া ও ভোলাগঞ্জ আদর্শ গ্রাম এলাকা (২১ জন): এই জোনের মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে কালা, দুলাল, আজিম, কলসুমা, রফিক, সানুর, রাজন, মিলন, আফতাব, কাউসার, বতু মিয়া, শুকুর, জুবের, হেলাল, আনু মিয়াসহ ২১ জনের একটি শক্তিশালী গ্রুপ।

উৎমা সীমান্ত এলাকা (২২ জন): সীমান্তের এই পয়েন্ট দিয়ে মাদক ঢোকানোর দায়িত্বে রয়েছেন শাহীন, হেলাল, তাজ উদ্দিন, ইল্লাল, মোস্তফা, দেলোয়ার, ফরমান, আব্দুর রহমান, বক্কর, নিজাম, সামসুদ্দীনসহ ২২ জন।

দয়ার বাজার এলাকা (১৩ জন): এখানে সক্রিয় রুফেজ, হামিদ ও জাবেদসহ ১৩ জন।

ছনবাড়ী এলাকা (৮ জন): মাদক কারবারে যুক্ত আশিক, তেরাব, ইলিয়াস, দানাই ও রাবুসহ ৮ জন।

অনুসন্ধানে মাদক ও চোরাচালান কারবারিদের সাথে ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নূর আহমদের অনৈতিক সম্পর্ক ও ‘মামলা বাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, জেলা যুবদল নেতা ফরহাদ হোসেনের মাধ্যমে আলী হোসেন নামের এক যুবক নির্দোষ ব্যক্তিদের মামলায় ফাঁসানোর ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে কাজ করছেন। পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকায় মাদক নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।


মাদকের এই ভয়াল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে অনেকেই হুমকির মুখে পড়ছেন। ভোলাগঞ্জ আদর্শ গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন রাজু মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়ে এখন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।

স্থানীয় ইসলামী চিন্তাবিদ ড. জিয়াউর রহমান জানান, বর্নী ও খাগাইল এলাকায় মাদকের আগ্রাসন থামাতে প্রশাসনের কঠোর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। 

উত্তর রণিখাই ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার ফয়জুর রহমানও সীমান্ত দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত মাদক প্রবেশের কথা স্বীকার করে বিজিবি টহল জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।


উপজেলার একজন মাধ্যমিক শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতরা প্রায় সবাই অল্পবয়সী। আমাদের চোখের সামনে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমরা শিক্ষক ও অভিভাবকরা চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।

সমাজসেবক মেহেদী হাসান রুবেল জানান, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়ে মাদক সিন্ডিকেটগুলো অতীতের চেয়ে আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।


কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া জানান, ২৯ জুন আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। বিজিবি টহল বাড়ানো এবং মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অপরাধীরা জেল থেকে বেরিয়ে পুনরায় ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত। বিপুল পরিমাণ চালানসহ অনেককে আটক করা হয়েছে। ভোলাগঞ্জ ফাঁড়ির ইনচার্জের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


সীমান্তের এই মরণনেশা রুখতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সমন্বিত এবং কঠোর উদ্যোগ না থাকলে কোম্পানীগঞ্জের যুবসমাজ পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

এই সম্পর্কিত আরো