সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন ট্যাক্স ইজারা টেন্ডার অবৈধভাবে প্রভাব খাটানো, অনিয়ম-হট্টগোল সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা, হট্টগোল ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী ইউনিয়ন ট্যাক্স ইজারার দরপত্র গ্রহণ ও উন্মুক্ত নিলাম কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এতে নয়জন ব্যবসায়ী অংশ নেন এবং নির্ধারিত নিয়মে দরপত্র জমা দেন। দুপুর ১২টায় ফলাফল ঘোষণার কথা থাকলেও ওই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিনের পক্ষে ইউনিয়ন উদ্যোক্তার সহকারী উজ্জ্বল আহমেদ একটি দরপত্র জমা দেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলেও সেটি গ্রহণে চেয়ারম্যান ও সচিবকে চাপ প্রয়োগ করেন কামাল উদ্দিন। এ নিয়ে উপস্থিত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনতার মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান নিলাম বাক্স উন্মুক্ত করার পর ইউনিয়ন উদ্যোক্তার সহকারী উজ্জ্বল আহমেদ সর্বোচ্চ দর দেখতে পান । পরে অন্যান্য নিলাম প্রত্যাশীরা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কীভাবে নিলামে অংশ নিলেন, যেহেতু তিনি ইউনিয়নের কর্মচারী। তখন তিনি জানান, কামাল মেম্বার তাকে নিলামে অংশ নিতে বলেছেন। এ সময় তার সঙ্গে কথাবার্তা চলাকালে কামাল মেম্বার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে উত্তেজিত জনতা ও ব্যবসায়ীরা পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। একপর্যায়ে কামাল উদ্দিন ও অন্যান্য নিলাম প্রত্যাশীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। স্থানীয় মুরব্বিরা হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিন বলেন, উজ্জ্বল আহমেদ লিখিতভাবে কোনো দায়িত্বে নেই, সে যে কারো জন্য দরপত্র আহ্বান করতে পারে। তার ওপর চড়াও হওয়ায় আমি প্রতিবাদ করি এবং পরে হামলার শিকার হই।
অন্যদিকে ইউনিয়ন উদ্যোক্তার সহকারী উজ্জ্বল আহমেদ দাবি করেন, আমি কামাল উদ্দিনের পক্ষে দরপত্র আহ্বান করেছি, আমার সঙ্গে আরও পার্টনার রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দায়িত্ব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে সেটি গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
নিলাম প্রত্যাশী রমজান আলী অভিযোগ করে বলেন, ৫ আগস্টের পরেও আমরা নিলামে অংশ নিয়েছিলাম। তখন ভয়ভীতি দেখিয়ে ২৫ লাখ টাকার নিলাম ৫ লাখ টাকায় নেওয়া হয়েছিল। এবার উজ্জ্বলকে দিয়ে কামাল মেম্বারের নির্দেশে আগে থেকেই দরপত্র দেখে সর্বোচ্চ ৬১ লাখ টাকার দর দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন উদ্যোক্তা হিসেবে উজ্জ্বল আহমেদের এমন ভূমিকা গ্রহণযোগ্য নয় এবং পুরো নিলাম প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
আরেক নিলামপ্রত্যাশী ও সাবেক মেম্বার ফারুক উদ্দিন বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে আমরা অংশ নিয়েছিলাম। বাক্স খোলার পর দেখি সর্বোচ্চ দর পেয়েছে উজ্জ্বল। পরে জানতে পারি কামাল মেম্বারের নির্দেশেই সে এই দর দিয়েছে। এতে নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, কারণ সে ইউনিয়ন তথ্যসেবায় কাজ করে। সে আগে থেকেই জানত কারা নিলামে অংশ নিচ্ছে এবং কত টাকার দরপত্র জমা দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসক বা ইউএনওর অবগতিতে হয়েছিল কি না তা তার জানা নেই এবং নিলামের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মামুন পারভেজ ও সচিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নিলামের বৈধতা ও ঘটনার বিষয়ে জানতে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সরকারি নম্বরে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অংশগ্রহণকারীরা নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।