টানা ভারী বর্ষণ, সীমান্ত দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে অকাল বন্যার শঙ্কা। চোখের সামনে কষ্টার্জিত বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার লাখো কৃষক। অনেক স্থানে বুকসমান পানিতে নেমে কাঁচা-পাকা ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের। এমন দৃশ্য দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৮ এপ্রিল থেকে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হলেও বৃষ্টির কারণে মাঠে পানি জমে থাকায় এবং শ্রমিক সংকটে ফসল ঘরে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলার নলোয়ার হাওরের ফসল ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হাওরপারের দাস নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরণ দাস জানান, ১৬ কিয়ার জমির মধ্যে মাত্র এক কিয়ারের ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন তিনি। একই এলাকার কৃষক এখলাছ মিয়া ও গৌরাঙ্গ দাস অভিযোগ করেন, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই ধান ডুবে গেছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক মঙ্গল মিয়া বলেন, ১৭ কিয়ার জমিতে অনেক টাকা খরচ করে চাষ করেছিলাম। কিন্তু জলাবদ্ধতায় কিছুই কাটতে পারিনি। সারা বছর পরিবার নিয়ে কী খাব, সেই চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছি।
জামালগঞ্জের পাগ্নার হাওর, দিরাইয়ের চাপতির হাওর, বিশ্বম্ভরপুরের খরচার হাওর এবং তাহিরপুরের শনি ও মাটিয়ান হাওরেও একই চিত্র দেখা গেছে। হাওরে পানি জমে থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন চালানো যাচ্ছে না। আবার পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় মাড়াই করা ধান শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় কৃষকদের লোকসানের বোঝা আরও বাড়ছে। বর্তমানে ধানের দাম মণপ্রতি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৭৮ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হলেও এখনও ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতায় প্রায় ৫ হাজার ৫০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
হাওরের ফসল রক্ষায় এবার সুনামগঞ্জে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের আওতায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে পাউবো। তবে হাওর সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসল নষ্ট হচ্ছে।
‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ বাঁধ নির্মাণের ফলেই কৃষকদের এই সর্বনাশ হয়েছে। এর দায় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নিতে হবে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানান, টানা বৃষ্টির কারণে বাঁধের মাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। উজান থেকে ভারতের চেরাপুঞ্জির ঢল নেমে এলে সেই চাপ সামলানো অনেক বাঁধের পক্ষেই কঠিন হয়ে উঠবে।
২০১৭ সালের ভয়াবহ অকাল বন্যার স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফেরে সুনামগঞ্জবাসীকে। সে বছর বাঁধ ভেঙে হাওরের সব ফসল তলিয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে আবারও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় ধান কাটা ও শুকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কৃষকদের দ্রুত ফসল সংগ্রহে সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করছি।