দেশজুড়ে ‘মৎস্য ভাণ্ডার’ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল। নদী, নালা ও ছোট-বড় বিল মিলিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলায় বছরে প্রায় ৪২ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। অথচ নানাবিধ মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণে প্রতি বছরই এই অঞ্চলে মাছের উৎপাদন কমছে, যার ফলে চরম হুমকিতে পড়েছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও হাজারো মৎস্যজীবীর জীবন-জীবিকা।
স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মতে, স্থায়ী অভয়াশ্রম না থাকা, প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলে পলি মাটি পড়ে ছোট-বড় বিল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া এবং নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী, রিং জাল ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার মাছ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন, সেচ দিয়ে বিলের তলা শুকিয়ে মাছ শিকার এবং জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছের বংশবৃদ্ধি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে হাওরে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নদী ও বিল-বাদাড়ে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্তির তালিকায় চলে গেছে।
এক নজরে জামালগঞ্জের মৎস্য পরিসংখ্যান, বার্ষিক উৎপাদন: ৪২ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন (চাহিদা ৩,৮২০ মেট্রিক টন), জলমহাল ও পুকুর: ৮২টি জলমহাল ও ৩১৫টি ছোট-বড় পুকুর, জেলেদের সংখ্যা: নিবন্ধিত ৯,৫০০ জন এবং অনিবন্ধিত ৬,৪৮০ জন, সমিতি: ৫৬টি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি।
হাওরের মাছের বিলুপ্তির জন্য ত্রুটিপূর্ণ ইজারা প্রথাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করছেন প্রকৃত জেলেরা। গোপালপুর গ্রামের মৎস্যজীবী জয়কিশোর দাস বলেন, “অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অ-মৎস্যজীবীরা নামে-বেনামে মৎস্যজীবী সংগঠন তৈরি করে জলমহাল ইজারা নিচ্ছে। বেশি মুনাফার আশায় তারা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিলের তলা শুকিয়ে, বিষাক্ত ওষুধ দিয়ে মাছের প্রজনন ধ্বংস করছে। মাছের উৎপাদন বাড়াতে বৈশাখ থেকে আষাঢ়—এই তিন মাস সরকারিভাবে সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা উচিত।”
একই সুর মেলালেন বিষ্ণুপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মনিলাল সরকার। তিনি বলেন, “একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জলমহালের সুবিধা ভোগ করায় প্রকৃত জেলেরা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারের উচিত এই অনিয়ম এবং হাওরে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করা।”
অবশ্য হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ইতিমধ্যে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছে, জেলেদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস ইবনে রহিম বলেন, “পাহাড়ি ঢলে নদী-নালা ভরাট, পরিবেশ দূষণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারের কারণে মাছের উৎপাদন কমছে। আমরা কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারী জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য আইন বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর।”
তিনি আরও যোগ করেন, ভরাট হওয়া জলাশয় খনন ও স্থায়ী মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে জলমহালগুলো যেন প্রকৃত জেলেরা পায়, তা নিশ্চিত করার জন্য মৎস্য বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।