দিনের আলো নিভে সীমান্ত ঘেঁষা সবুজ পাহাড়ে অন্ধকার নামতেই বদলে যায় সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ কোম্পানীগঞ্জের রূপ। ওপারে ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়, এপারে বাংলাদেশের শান্ত জনপদ। কিন্তু এই ভৌগোলিক শান্ত রূপের আড়ালে প্রতি রাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার জগৎ। কাঁটাতারের ফাঁক গলে, নদীর বাঁক বেয়ে আর পাহাড়ি ছড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকার চোরাচালানের পণ্যের সঙ্গে নির্বিঘ্নে দেশে ঢুকছে মরণনেশা মাদক। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও খোদ থানা পুলিশের একাংশকে নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘লাইন খরচ’ দিয়ে ম্যানেজ করেই বছরের পর বছর ধরে চলছে এই সীমান্ত বাণিজ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার উৎমা, বরম, চিকাডহর ও নারাইনপুর—এই চারটি প্রধান পয়েন্ট দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চোরাচালানের মহোৎসব। সীমান্তের ওপাড় থেকে অবাধে আসছে ভারতীয় জিরা, কসমেটিকস, প্রিমিয়াম বিস্কুট, চিনি, ফুচকা, গাড়ির টায়ার ও আইপিএস থেকে শুরু করে ভারতীয় গরু ও মহিষের বড় বড় চালান। তবে এসব বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশ ধ্বংসকারী ভয়াবহ মাদক।
সরেজমিন ও স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বরম ও উৎমা সীমান্ত এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এই চক্রটির ওপর স্থানীয় যুবদল নেতা মুস্তাকিম আহমদ ফরহাদের একক আশীর্বাদ রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। অতীতে উৎমা ছড়ার বালু ও পাথর লুটের কুশীলব হিসেবে বিতর্কিত এই নেতার নাম এবার সীমান্তে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণেও উচ্চারিত হচ্ছে। সম্প্রতি এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরেও তাঁর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য—আগে উৎমা সীমান্ত একক নিয়ন্ত্রণে জিম্মি থাকলেও, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নতুন ‘রাঘববোয়ালদের’ উত্থানে সীমান্ত এলাকা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
উৎমা ও বরম সীমান্তে মাদকের চালান পারাপারে সক্রিয় রয়েছে নোয়াগাঁওয়ের আইন উদ্দিন ও সাইফুল, কাকুরাইলের সালাম এবং বরম সিদ্ধিপুরের রাসেল চক্র। অন্যদিকে, সীমান্ত দিয়ে লাখ লাখ টাকার চোরাই ভারতীয় গরু পাচারের নেপথ্য কারিগর হিসেবে স্থানীয় এক ইউপি সদস্য (মেম্বার) দেলোয়ারের নাম উঠে এসেছে।
এছাড়া মাঝেরগাঁওয়ের ইল্লাল ও শাহীন এবং কালাইরাগের আলিম উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন চক্রটি ভারতীয় শুকনো ও বিলাসবহুল পণ্যের রমরমা কারবার চালাচ্ছে। ভারত থেকে আনা পণ্যগুলো শুরুতে সীমান্তবর্তী দয়ার বাজার, পাড়ুয়া ও বউ বাজার এলাকার গোপন গুদামে মজুদ করা হয়। এরপর গভীর রাতে বিশেষ ট্রাকে বা কাভার্ডভ্যানে তা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে মাদকের পরিবহন কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের তথ্য মিলেছে। একসময় সীমান্তবর্তী নদীপথ ব্যবহার করে নৌকায় মাদক পরিবহন করা হতো। কিন্তু এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে স্থানীয় দিনমজুর ও শ্রমিকদের দিনভিত্তিক মজুরিতে ‘ক্যারিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উত্তর রণিখাই সীমান্ত হয়ে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে মাদক সরাসরি চলে যায় দক্ষিণ রণিখাই এলাকার গৌরিনগরে। সেখানে স্থানীয়ভাবে ‘মাদক জোন প্রধান’ হিসেবে পরিচিত তাজউদ্দীনের আস্তানায় এসব মাদকের চালান জমা হয় এবং সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় পরবর্তী বিপণন।
অনুসন্ধানে পাওয়া সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—এই চোরাচালান নির্বিঘ্ন রাখতে নিয়মিত বিরতিতে পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করা হয়। প্রতিটি চোরাই পণ্যের গাড়ি থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং মাদক জোনগুলো থেকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে মোটা অঙ্কের মাসোহারা আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে চাঁদা আদায়ের এমন দুটি পৃথক অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। যাতে স্পষ্টতই এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার প্রত্যক্ষ আশ্রয় ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়মিত অর্থ লেনদেনের বিষয় উঠে এসেছে।
পুলিশের এমন অপতৎপরতার নজির মিলেছে ৩০ সেপ্টেম্বর। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, উৎমা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় ফুচকা ও বিস্কুটের বস্তা নিয়ে দ্রুতগতিতে আসার সময় দয়ার বাজার এলাকায় একটি দেশীয় গরুকে সজোরে ধাক্কা দেয় চোরাকারবারীদের মোটরসাইকেল। এতে গরুটি গুরুতর রক্তাক্ত হলে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা চোরাই মালামালসহ চালক ও গাড়িটি আটক করে। কিন্তু ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে হাজির হন ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির এক কনস্টেবল। তিনি স্থানীয়দের কোনো কথা না শুনে উল্টো মালামাল ও গাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ফাঁড়ি ইনচার্জ জাহাঙ্গীর ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয়দের জিম্মি করে মালামাল ছাড়িয়ে নিতে চাপ দেন এবং ছাড় না দিলে উল্টো আটককারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। গোটা ঘটনার সুস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজও সংরক্ষিত রয়েছে।
এ বিষয়ে ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাহাঙ্গীরের সাথে কথা বললে তিনি ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেন। তবে হুমকির বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে দাবি করেন, ‘বিষয়টি স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছিল।’
অপরদিকে চিকাডহর সীমান্তে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে একই গ্রামের বাসিন্দা রাজুর সিন্ডিকেট। পাশাপাশি জালিয়ার পাড় গ্রামের শাহরিয়ার ও আলী হোসেনের চক্রটিও চোরাচালানে সমানভাবে সক্রিয়।
গত ৫ অক্টোবর সকালে সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কের উপজেলা গেট সংলগ্ন পুলিশ চেকপোস্টে ট্রাকভর্তি মাদকের চালান আটক নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে দেখা দিয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা। পুলিশ এটিকে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সফল অভিযান দাবি করলেও, স্থানীয় সচেতন বাসিন্দারা একে ‘আইওয়াশ’ বা সাজানো নাটক হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ—চালানটি মূলত মাদক কারবারি রাজুর হলেও, প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশ থাকায় মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নেয়নি পুলিশ।
দক্ষিণ রণিখাইয়ের এক সচেতন নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে অন্তত লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে রাতের আঁধারে গোপনে এসব চলত। এখন পুলিশের প্রকাশ্য মদদে প্রকাশ্য দিবালোকে চোরাচালান চলছে। বাধা দিতে গেলে সাধারণ মানুষকেই উল্টো পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়।’
চোরাচালানে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত যুবদল নেতা মুস্তাকিম আহমদ ফরহাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অপর অভিযুক্ত রাজু মিয়া মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘চেকপোস্টে কার মাদক আটক হয়েছে তা আমার জানা নেই। চিকাডহর গ্রামে রাজু নামের আরও অনেকেই রয়েছে, আমাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হচ্ছে।’
এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. উসমান গণির সরকারি নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি 'ব্যস্ত আছেন' জানিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে সামগ্রিক বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে মাদক ও চোরাচালানের বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আসন্ন উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ বিষয়ে বিজিবি ও পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো. সম্রাট তালুকদার জানান, ‘মাদক ও চোরাচালানের ক্ষেত্রে পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চোরাকারবারীদের সুবিধা দেওয়ার বা আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সীমান্তের এই চোরাচালান ও মাদকের আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে কোম্পানীগঞ্জের যুবসমাজ বিপথগামী হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংসের মুখে পড়বে স্থানীয় বৈধ ব্যবসা ও দেশীয় শিল্প—এমনটাই মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।