সিলেটের শাহপরাণ থানাধীন বালুচর এলাকা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই একজন ‘ভাঙ্গারি’ কিংবা খুচরা ব্যবসায়ী খালেদ আহমেদ। কিন্তু এই সাধারণ ব্যবসার সাইনবোর্ডের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক দুর্ধর্ষ অপরাধের জাল। স্থানীয়দের চোখে যিনি একসময় ছিলেন আতঙ্কের প্রতীক, পুলিশের নথিতে তিনি একাধিক গুরুতর মামলার দাগি আসামি এবং আদালতের সাজা পরোয়ানাভুক্ত পলাতক অপরাধী। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে কোণঠাসা হয়ে এই অপরাধ চক্রটি যখন পিঠ বাঁচাতে উল্টো পুলিশের বিরুদ্ধেই কল্পকাহিনি ফাঁদতে শুরু করেছে, তখন বেরিয়ে আসছে পিতা-পুত্রের অপরাধ সাম্রাজ্যের রোমহর্ষক সব তথ্য।
অনুসন্ধান ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বালুচরের খালেদ আহমেদ স্থানীয় যুবলীগের রাজনীতির পরিচয় ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি কথিত ‘ভাঙ্গারি’ ব্যবসার কথা বললেও মূলত এটি ছিল তাঁর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার আবরণ। এই ব্যবসার আড়ালে খালেদ সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাকারবার এবং অবৈধ পণ্যের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। শুধু তা-ই নয়, বালুচরের কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বুলেট মামুন’-এর প্রধান সহযোগী হিসেবে এলাকায় চাঁদাবাজি, ভূমি দখল এবং সরকারবিরোধী নাশকতামূলক তৎপরতায় বড় অঙ্কের অর্থের যোগান দিতেন এই খালেদ।
অপরাধের এই ধারা কেবল খালেদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর উত্তরসূরির মধ্যেও। খালেদের ছেলে রায়হান নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় নেতা। সম্প্রতি সিলেট বিমানবন্দর থানার টিভি গেইট এলাকায় রায়হানের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বেই সরকারবিরোধী ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার অপচেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তীতে বালুচর এলাকায় আরেকটি বড় ধরনের নাশকতামূলক মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হয় রায়হান।সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলায় সে বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে। বাবা চোরাকারবার ও অর্থের যোগানদাতা, আর ছেলে রাজপথের নাশকতার ক্যাডার—বালুচরে এই পিতা-পুত্রের ত্রাস ছিল ওপেন সিক্রেট।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খাতায় খালেদ আহমেদের নাম কোনো সাধারণ অভিযোগের তালিকায় নেই। ২০২০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে একের পর এক চাঞ্চল্যকর মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
পুলিশের সংরক্ষিত নথিতে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে ৪ টি মামলা চলমান রয়েছে এবং এদরে মধ্যে একটি মামলায় আদালত কতৃক সাজা প্রদান করা হয়েছে। এ
এসব মামলা সূত্রে তার জানাযায়, তার বিরুদ্ধে মারধর, রক্তক্ষয়ী সংঘাত, মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৭, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬ ও ৩০৭ ধারাসহ নারী লাঞ্ছনা (৩৫৪ ধারা), চুরি (৩৭৯ ধারা), ভাঙচুর (৪২৭ ধারা) ও প্রাণনাশের হুমকির (৫০৬ ধারা) মতো মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে দ্রুত বিচার আইনের কঠোর মামলা এবং আর্থিক প্রতারণামূলক দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (এনআই অ্যাক্ট)-এর ১৩৮ ধারায় মামলা।
সিলেটজুড়ে চিহ্নিত মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে যখন পুলিশ জিরো-টলারেন্স নীতিতে অভিযান শুরু করে, তখনই বালুচরে খালেদের আস্তানায় চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়। অপরাধের জাল গুটিয়ে আসার ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে খালেদের সিন্ডিকেট।
গ্রেফতার এড়াতে এবং পুলিশের মনোবল ভেঙে দিয়ে চলমান অভিযান বাধাগ্রস্ত করতে তারা বেছে নেয় পুরোনো কৌশল—একটি বিশেষ মহলের মাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘বাসায় ঢুকে ভাঙচুর ও শ্লীলতাহানির’ বানোয়াট অভিযোগ তোলা হয়।
শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমেদ বলেন, ‘অভিযুক্ত খালেদের স্ত্রীর সঙ্গে আমার কখনো দেখাই হয়নি, আমি তার বাসাতেও যাইনি। ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এবং চলমান সাঁড়াশি অভিযানকে বিতর্কিত করতেই একজন পলাতক সাজাপ্রাপ্ত আসামির পরিবার এমন কাল্পনিক গল্প ফাঁদছে।’
ওসি আরও স্পষ্ট করেন, সেদিন বালুচরের একাধিক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির ঠিকানায় নিয়মতান্ত্রিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। পুলিশের এই পদক্ষেপে সাধারণ জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সরকারবিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত অপরাধী চক্রটি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একজন চিহ্নিত অপরাধী নিজেকে বাঁচাতে পরিবারের নারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে—যা কাপুরুষোচিত। ভাঙ্গারির আড়ালে দেশবিরোধী নাশকতা আর চোরাকারবারের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার এই অপচেষ্টা রুখে দিয়ে দ্রুত খালেদ আহমেদকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি বালুচরবাসীর।