প্রকৃতির রূপসী কন্যা জাফলংয়ের আঁচল যেন খুবলে খাচ্ছে একদল 'নিশাচর' দস্যু। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজিপুর এবং এর আশপাশের গ্রামগুলো এখন এক লুন্ঠিত জনপদ। পিয়াইন নদীর বুক থেকে নিষিদ্ধ পেলোডার ও ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবিরাম বালু উত্তোলনের ফলে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী হাজিপুর গ্রাম। একদিকে পিয়াইন নদীর তীব্র ভাঙন, অন্যদিকে ধূলোবালিতে বিষিয়ে ওঠা জনস্বাস্থ্যড়সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যায়ের দ্বারপ্রান্তে এই অঞ্চল।
সরেজমিনে হাজিপুর ও প্রতাপপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ধ্বংসের এক বীভৎস চিত্র। একসময় নদী থেকে কয়েকশ মিটার দূরে থাকা বসতভিটাগুলো এখন ভাঙনের মুখে। হাজিপুর এলাকার পিয়াইন নদীর পাড় ঘেঁষে গভীর গর্ত খুঁড়ে বালু তোলায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে সরাসরি আঘাত হানছে লোকালয়ে বিপন্ন পিয়াইন নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় হাজিপুর ও প্রতাপপুরের কয়েকশ বিঘা ফসলি জমি। হুমকির মুখে পড়েছে জাফলং চা বাগানের ঐতিহ্যবাহী লুনি ফুটবল মাঠসহ আরও তিনটি খেলার মাঠ। লুনী গ্রামের অমৃকা লাল ও কুলন্দ নাথের সাজানো সংসার যেকোনো সময় নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে। আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন ও কমল নাথের মতো সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল এখন বালু দস্যুদের লোলুপ দৃষ্টির বলী।
গত কয়েকদিন ধরে চলা অনুসন্ধানে রাধানগর পয়েন্টে দেখা গেছে বালু দস্যুদের এক অন্ধকার রাজত্ব। মাঝরাতে কয়েকশ ট্রাকের দীর্ঘ সারি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কামরুল ইসলাম ও খায়রুল আমিনের নেতৃত্বে চলছে এই বিশল কর্মযজ্ঞ। টর্চলাইটের আলোয় চলে ট্রাক পাস দেওয়ার কাজ।
অনুসন্ধানী দলের উপস্থিতিটের পেয়ে কামরুল ও খায়রুল কৌশলে সটকে পড়ার চেষ্টা করেন। এমনকি সংবাদ প্রকাশ না করার বিনিময়ে সাংবাদিকদের রাতের খাবারের আপ্যায়ন ও অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তারা। কামরুলের দাবি, তারা এক যুবদল নেতার ছত্রছায়ায় হাজিপুর বালু মহালের 'ইজারা'র কথা বলে এই কারবার চালাচ্ছেন। যদিও ওই যুবদল নেতা ইজারার কোনো বৈধ নথিপত্র দেখাতে পারেননি। শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় কয়েক লাখ টাকার বালু অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়। বালিখেকো চক্রের মধ্যে লুনি গ্রামের কামরুল ইসলাম ও খায়রুল আমিন ছাড়াও ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ, দেলোয়ার হোসেন, আল আমিন মুন্সি রয়েছেন। তাদের রয়েছে একটি সঙ্গবদ্ধ লাঠিয়াল বাহিনী।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই চক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে গত এক যুগে ২৫ থেকে ৩০টি মামলা হলেও তারা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। গত বছর থেকে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক, এমদাদুর রহমানসহ অনেক এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে গণস্বাক্ষরিত আবেদন দিলেও বালু দস্যুদের হাত থেকে রেহাই মেলেনি। উল্টো প্রতিবাদ করতে গিয়ে দক্ষিণ প্রতাপপুরের মাহবুব হোসেন বুলবুলের মতো সাধারণ মানুষকে পড়তে হয়েছে শারীরিক লাঞ্ছনার মুখে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের অভিযানের খবর সিন্ডিকেটের কাছে আগেই পৌঁছে যায়। ফলে অভিযানে শুধু সাধারণ দিনমজুররাই ধরা পড়ে, কিন্তু পর্দার আড়ালের কুশীলবরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন পরিষদে 'ইউনিয়ন ট্যাক্স' ইজারা নিয়ে যে হট্টগোল ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তা এই সিন্ডিকেটের হাতকেই আরও শক্তিশালী করেছে। বর্তমানে ইজারার দোহাই দিয়ে অবৈধভাবে প্রতিটি ট্রাক থেকে চাঁদা তুলছে এই চক্রটি।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, হাজিপুর এলাকা ইজারার আওতায় থাকলেও অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা কঠোর। ইতিমধ্যে খায়রুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামানও অবৈধ বালু উত্তোলনে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
তবে হাজিপুরবাসীর দাবি এখন একটাই-সাময়িক জেল-জরিমানা নয়, হাজিপুর পয়েন্টে একটি স্থায়ী পুলিশি নজরদারি চৌকি স্থাপন করতে হবে। পিয়াইন নদী ও হাজিপুর গ্রামকে রক্ষা করতে হলে এই রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, অচিরেই সিলেটের পর্যটন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যের এই হাজিপুর জনপদ।