মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
গণমাধ্যম

অভ্যুত্থানের খবর করা সাংবাদিকরাই এখন হত্যা মামলার আসামি

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও নাশকতার মামলা এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানী বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবন বাজি রেখে আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করা অনেক সাংবাদিকই এখন মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে বা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

রাষ্ট্রীয় কঠোর নজরদারি, হুমকি ও সহিংসতার মধ্যেও যাঁরা ঘটনাস্থল থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁদেরই একটি অংশ এখন ‘বিচারাধীন আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত—এমন অভিযোগ তুলেছেন সাংবাদিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনরা।

বিভিন্ন মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত কয়েকশ সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের মামলায় জড়িয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, এই সময়ে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে— ৫৮৫ জন সরাসরি হামলার শিকার, ১৭৪ জন হত্যা মামলার আসামি, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি, ৩৭ জন নাশকতা মামলার আসামি, ৬ জন সাংবাদিক নিহত।

এমএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি ৬২২ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন।

অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ১৭ মাসে ৪২৭টি হামলায় ৮৩৪ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, যার মধ্যে ৩৭৯ জন আহত এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তার হন।

টিআইবি’র মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার এবং ১৮৯ জন চাকরিচ্যুত হয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক নেতারা বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে এই স্তম্ভকে পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো প্রমাণ করা কঠিন হবে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।

তিনি আরও বলেন, স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের আইনে এই নামে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ নেই। এটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি আরও যোগ করেন, ভবিষ্যতে সাংবাদিকরা তাঁদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।

প্রতিবেদনে একাধিক ঘটনার উদাহরণ উঠে এসেছে, যেখানে নিহত ব্যক্তির পরিবারের অজ্ঞাতে বা দূর সম্পর্কের সূত্রে সাংবাদিকদের আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

একটি মামলায় কুড়িগ্রামে এক তরুণের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিকদের আসামি করার অভিযোগ ওঠে। আবার লালমনিরহাট ও রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের মামলা বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত জানেন না কীভাবে মামলা করা হয়েছে বা কেন সাংবাদিকদের আসামি করা হয়েছে।

সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানিয়েছেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছি, যাঁদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, এই মামলাগুলো আমাদের সময়ে হয়নি। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেছে। হত্যা মামলাগুলো রিভিউ করা হবে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো ফরমালি প্রত্যাহার করা হবে।

সাংবাদিক নেতা ও সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছি, যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, এসব মামলা রিভিউ করা হবে এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, গত তিন মাসে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত হয়নি। সাংবাদিকদের বিষয়গুলো তিনি খেয়াল রাখবেন।

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়টি প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রী আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারিভাবে মামলাগুলো পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে হয়রানি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সাংবাদিকরা।

বিভিন্ন জেলায় করা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু সাংবাদিক এখনো হত্যা ও নাশকতা মামলায় আসামি হয়ে আত্মগোপনে আছেন, কেউ কেউ চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কিছু সাংবাদিক জানিয়েছেন, তাঁরা ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন না, তবুও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের এই মামলাজট ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ নিয়ে এখন দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের।

এই সম্পর্কিত আরো