২৫৫ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেবেন। তিনি হবেন দেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি। এর আগে ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, ওই দিনই জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তিনি ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সে হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৪তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থীর জয় আগেই নিশ্চিত ছিল। তবু প্রতিদ্বন্দ্বী থাকায় তফসিল অনুযায়ী গতকাল ভোট গ্রহণ করা হয়। এর আগে ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ওই বছরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথম ভোট হয়েছিল।
গতকাল বেলা ২টা থেকে জাতীয় সংসদের সংসদ কক্ষে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোট গ্রহণের শেষ সময় ছিল বিকেল ৫টা। ভোট গণনায় সময় লাগে ২০ মিনিটের মতো। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন ভোটের ফলাফল ঘোষণা করেন। নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন। আর ৬ জন ভোট দেননি।
ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সংসদ কক্ষে পাশের আসনে থাকা নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে একটি গোলাপ ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। এ সময় সংসদ সদস্যরা বিপুল করতালি ও টেবিল চাপড়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান। সবার উদ্দেশে হাত নেড়ে ও সালাম দিয়ে জবাব দেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নিজ আসন থেকে উঠে সামনে এগিয়ে আসেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এগিয়ে আসেন। তাঁরা দুজন কোলাকুলি করেন। পর্যায়ক্রমে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজনের সঙ্গে কোলাকুলি করেন মির্জা ফখরুল। একপর্যায়ে সংসদ কক্ষের মাঝখানে সংসদ নেতা তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়।
রাতে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
ভোট হলো যেভাবে
ভোট গ্রহণ শুরুর আগে বেলা একটার দিক থেকেই সংসদ সদস্যরা আসতে শুরু করেন। বেলা ২টার কিছু সময় আগে সংসদ কক্ষে ঢোকেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। বেলা দুইটায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। নির্বাচন পরিচালনার জন্য বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। এ ছাড়া ছিলেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ ও সংসদ সচিবালয়ের সচিব গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া।
নির্বাচন পরিচালনায় ইসি ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা সহায়তা করেন। ভোট শুরু হওয়ার আগে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স তিনটি খালি আছে কি না, পরীক্ষা করে দেখেন।
শুরুতে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের জানান সিইসি। নিজ নিজ আসনে ছিলেন সংসদ সদস্যরা। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের জন্য সংসদ কক্ষের মাঝখানে দুটি আসনের ব্যবস্থা করা হয়।
বেলা ২টা ১০ মিনিটের দিকে ভোট গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়। সংসদ সদস্যদের আসনে ব্যালট পৌঁছে দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। নিজ আসনে বসে ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। পছন্দের প্রার্থীর পাশে নিজের পূর্ণ নাম সই করে ভোট দেন তাঁরা।
সবার আগে ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্সে দেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর কায়সার কামাল। পরে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ভোট দেন। পরে পর্যায়ক্রমে সংসদ সদস্যরা ব্যালট বাক্সে জমা দেন। সংসদ কক্ষে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের পরস্পরের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় ও ছবি তুলতে দেখা যায়। তিনটার মধ্যেই কক্ষে উপস্থিত প্রায় সব সংসদ সদস্যের ভোট দেওয়া শেষ হয়। চারটার কিছু সময় পর ভোট দেন হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান। বিরোধী দলের প্রার্থী অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় তাঁর ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
যে ৬ জন ভোট দেননি
সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনসহ জাতীয় সংসদে মোট সদস্য ৩৫০। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। ফলে এখন সংসদ সদস্য আছেন ৩৪৯জন। ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন।
যে ৬ জন ভোট দেননি তাঁরা হলেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য আবুল হাসান এবং বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস, ওসমান ফারুক ও মোস্তফা কামাল পাশা।
এর মধ্যে মির্জা আব্বাস বিদেশে ও মোস্তফা কামাল চিকিৎসাধীন। তাঁরা আগেই দলকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ওসমান ফারুকও বিদেশে অবস্থান করছেন। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। তাঁকে ভোট দিতে দেখা যায়নি। আবুল হাসান বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তাঁর দলের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
ভোট না দেওয়ার একাধিক কারণ তুলে ধরে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অর্থহীন মনে হয়েছে। কারণ, ভোটে অনিশ্চয়তা না থাকলে সেটা কোনো নির্বাচন নয়। এই ভোটের ফলাফল কী, তা সবার জানা। তাহলে এটাকে ভোট কেন বলব। সুতরাং এটা মনোনয়ন, নির্বাচন নয়।’
ভোটের হিসাব
৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্য আছেন ২৪৭ জন। তাদের মিত্র বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য আছেন। সে হিসাবে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের মিলিয়ে ছিল ২৫০ ভোট। বিদেশে থাকায় বিএনপির তিনজন সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারেননি। বিএনপি ও তাদের মিত্রদের ২৪৭ জন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন ও ৭ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে বিএনপির প্রার্থী পান ২৫৫ ভোট।
অন্যদিকে বিরোধী দলে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আছেন ৭৮ জন (এর মধ্যে জামায়াতের সমর্থনে একজন সংরক্ষিত নারী আসনে সদস্য হয়েছেন জাগপা থেকে), এনসিপির আছেন আটজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন, খেলাফত মজসিলের একজন। সব মিলিয়ে বিরোধী শিবিরে ভোট ছিল ৯০টি। এর মধ্যে দুজন ভোট দেননি। তাদের প্রার্থী পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
গতকাল ভোট চলাকালে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, দলটির একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ ভোটদানে বিরত থাকবেন। অবশ্য বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে ওই সংসদ সদস্যকে ভোট দিতে দেখা যায়।
পরে সন্ধ্যায় গাজী আতাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়ায় তাঁরা ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, আগামী নির্বাচন জুলাই সনদের আলোকে হবে এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হবে। এই আশ্বাসে তাঁরা পরবর্তী সময়ে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।