সম্প্রতি কার্টুন শেয়ারের দায়ে হাসান ইনাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সংসদে অভিযোগ তোলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। এই অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি।
রোববার (১৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে বিকেলে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এ অভিযোগ তোলেন।
গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, হাসিনা আমলেও কার্টুন শেয়ার বা কটূক্তির জন্য গ্রেপ্তার করা হতো। আমরা কল্পনাও করতে পারিনি এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও এমনটা ঘটবে। চিফ হুইপ মহোদয় আমাদের ইনভাইট করেছিলেন এবং একটি রূপক বা স্যাটায়ার (তিমি ও হাঙ্গর) ব্যবহার করেছিলেন। সেইটা মিম শেয়ার করার কারণে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় মামলা হয়েছে।
হাসনাত প্রশ্ন তোলেন, ২৫ ধারা মূলত যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োগের কথা, কিন্তু একটি মিম শেয়ার করার মধ্যে যৌন নির্যাতন কোথায়? বিরোধী মত দমনের জন্য এই আইন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং জামিনও দেওয়া হচ্ছে না।
হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী অধিকারের প্রশ্ন (কোশ্চেন অফ প্রিভিলেজ) উত্থাপনের জন্য দুই ঘণ্টা আগে নোটিশ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। পরে এ বিষয়ে নোটিশ দিতে বলেন।
হাসনাতের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন চিফ হুইপ। চিফ হুইপ বলেন, অনেকগুলো চিঠি দিয়েছি। জিডিও করেছি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। আমি নিজে, মানে আমার দলের লোকেরা করেছে। জিডি করা হয়েছে ১/১২, ১৭/১২ এবং ২০/১২ ২০২৫ তারিখে। এটা ফেসবুকে আছে। আমার ফেসবুকে আমি লিখে দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে এবং আমার দলের বিরুদ্ধে, আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য কুৎসা রটনা হয়েছে। মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিমূলক, অসৌজন্যমূলক এবং কুরুচিপূর্ণ অনেক কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের মন্ত্রীদের নিয়ে তখন কেউ মন্ত্রী হয়, এমপি হয় নাই, এরকম সময়। তো আমরা আমরা বলেছি, কতগুলো ফেইক আইডি দিয়ে এগুলো করা হয়। অনন্যপায় হয়ে তখন আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে তার কাছে কাগজ দিয়েছি। সেটা জানুয়ারি মাসে। কাগজ দিয়ে বলেছি, এসব ফেক আইডি থেকে যেসব প্রচার হয় তা বন্ধ করার চেষ্টা করুন। পরে আমি রিটার্নিং অফিসারকেও ওই এক আরেকটা চিঠি দিয়েছি, রিসিভ করা কপি সব আমি দেখাচ্ছি। এখানে সবই রিসিভ করা কাগজ।
হাসনাতকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মাননীয় সদস্য উনি সঠিক জানেন না বা জানতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে আইন শৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে আমরা বলেছি যে, যারা ফেক আইডি দিয়ে এটা করে, আপনারা তাদের বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসেন। কিন্তু ফাইনালি নির্বাচনের আগে আমরা করতে পারিনি। গতকাল (শুক্রবার) আমি পত্রিকায় দেখেছি যে এক ভদ্রলোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাননীয় স্পিকার আমি আপনাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং পরিস্কার করে বলতে চাই- কার্টুন আমার ব্যাপারে আকার কারণে কেউ যদি গ্রেপ্তার হয়, তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি আপনার মাধ্যমে এই সংসদে। এখন পর্যন্ত আমরা জানি না এইসব সাইবার কার্যক্রমের সাথে ওই ভদ্রলোক জড়িত কিনা।
আমরা তথ্য সংগ্রহ করেছি। এক ভদ্রলোক হাসান নামে অনেক কিছু কার্যক্রমে জড়িত এবং সাথে মানি লন্ডারিংয়ে জড়িত। এরকম অনেক ইনফরমেশন এখানে আছে। এটাও কতখানি সঠিক তা আমি জানি না। কাজেই আমার বক্তব্য হলো এই ভদ্রলোক যদি সেই ভদ্রলোক হয় যিনি এই সাইবারের কার্যক্রমের সাথে জড়িত। আমি মনে করি এইটা গভীরভাবে ক্ষতিয়ে দেখা উচিত সরকার, বিরোধীদল এবং দেশের স্বার্থে। পর্যালোচনা করে যদি সঠিক হয়, আমি মনে করি সেটা আইনের আওতায় আনা উচিত।
লিখিত প্রশ্নোত্তর টেবিলে নয়, সংসদে আলোচনা চান হাসনাত
জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর পর্ব মৌখিকভাবে না নিয়ে কেবল টেবিলে উপস্থাপন করার বিষয়ে হাসনাত বলেন, উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা না হওয়ার ফলে সংসদ সদস্যরা অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহিতা এড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ফাংশনাল পার্লামেন্টের জন্য মন্ত্রীদের সরাসরি প্রশ্ন করা এবং তাদের কাছ থেকে উত্তর পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে দেখছি তারকা চিহ্নিত প্রশ্নগুলো শুধু টেবিলে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে যে উত্তর লিখে দেওয়া হয়, মন্ত্রীরা শুধু সেটাই আমাদের দিচ্ছেন। এতে আমাদের সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ থাকছে না। সংসদ কি তাহলে কেবল একটি স্ক্রিপ্টেড মনোলগ সেশনে পরিণত হবে?
তিনি আরও বলেন, আমাদের কথা বলার জায়গা খুবই সীমিত। মাত্র এক-দেড় মিনিট সময় পাই। সেই সময়ে আমরা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মন্ত্রীদের প্রশ্ন করি। কিন্তু এই প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আমরা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছি।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা এ পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা প্রশ্নোত্তর পর্ব নিয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যের অভিযোগের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, বিরোধী দলীয় সদস্যের কথা আংশিক সঠিক। প্রশ্নোত্তর পর্ব সকল সদস্যের অধিকার। তবে বিরোধী দলীয় নেতা প্রস্তাব করেছেন যেন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ১২ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সংসদ শেষ করতে হলে এবং এই দীর্ঘ আলোচনা শেষ করতে হলে আমাদের হাতে সময় কম। সে কারণেই প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে দেওয়া হচ্ছে। তবে সদস্যরা যদি রাত ১০টা পর্যন্ত সংসদ চালাতে একমত হন, তবে আমরা টেবিল করতে চাই না, আমরা জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী।