জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুলির আঘাতে চোয়াল ও নাক ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় খোকন চন্দ্র বর্মণের। দেশে চিকিৎসা গ্রহণের একপর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে পাঠানো হয় রাশিয়ায়। চতুর্থবারের মতো চিকিৎসা নিতে এখন রাশিয়ায় অবস্থান করছেন এ জুলাই যোদ্ধা। সার্জারি করে এবার তার নাক ও চোয়ালের আকৃতি পুনরায় দেয়া হবে বলে জানা যায়।
খোকনের মতো আরো ১৫৩ জন জুলাই যোদ্ধার দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসা নেয়ার বিষয়টি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত তথ্যে উঠে আসে।
২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উত্থাপিত তথ্যমতে, ১৫৪ জন জুলাই যোদ্ধার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত ৩৮৭ কোটি ২২ লাখ ১১ হাজার ৯৩৩ টাকা ব্যয় হয়েছে। এটিসহ এ পর্যন্ত শহীদ পরিবারের জন্য সঞ্চয়পত্র, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন অনুদান, শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বাবদ মোট ১ হাজার ৪৫ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার ৩১২ টাকা ব্যয় হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন আইন, ২০২৬' -এ জুলাই যোদ্ধাদের বিষয়ে সরকারের কার্যক্রম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। সেভাবেই আমরা কাজগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে জুলাই যোদ্ধাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করার কাজটিও অন্তর্ভুক্ত। সেই সঙ্গে কারা বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাবেন—এ নিয়ে হাসপাতালের বোর্ডসহ কয়েকটি পর্যায়ে তদারকির পরই সেটি নিশ্চিত করা হয়। ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রেও পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জুলাই যোদ্ধাদের বাছাই করে তাদের সেবাগুলো দেয়া হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম ইসলামিয়া কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলেন ইয়াশ। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই বহদ্দারহাটে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ভর্তি করা হয় চিটাগং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরবর্তী সময়ে ডাক্তারের পরামর্শক্রমে পায়ের অপারেশন করা হয়। কিন্তু অপারেশনের সময় ভেতরে গজ রেখেই সেলাই করে দেয়া হয়, যা পরবর্তী সময়ে ইনফেকশন হয়। বন্ধ হয়ে যায় তার কথা বলা। দেশের নানা চিকিৎসা শেষে অবশেষে বিদেশে চিকিৎসা নিতে সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো হয় এ জুলাই যোদ্ধাকে। ১৬ মাস ধরে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন ইয়াশ। উন্নতি বলতে পায়ে ভর দিয়ে এখন দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু এখনো বাকশক্তি ফিরে পাননি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শাখা) উপসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩১ জন, একজন রাশিয়ায়। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নেয়াকালে মারা গেছেন একজন। অন্য একজন দেশে ফেরত এসে মারা গেছেন। বর্তমানে আরো ১৫ জন জুলাই যোদ্ধাকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার জন্য নেয়া হবে।’
এর আগে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১৭ জুন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। যেখানে সরকার কর্তৃক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রদেয় এককালীন ও মাসিক অনুদান, আহতদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান এবং শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ অন্য বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরই অধ্যাদেশটি সংসদে পাস হয়।
এর পর পরই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, নিহতদের পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন এবং গণ-অভ্যুত্থানের আদর্শকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর গঠন করে সরকার। ওই অধিদপ্তরের একটি তহবিলের কথা উল্লেখ করা হয়।
এ তহবিল সম্পর্কে বলা হয়, ‘যাহা “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ এবং জুলাই যোদ্ধা কল্যাণ ও পুনর্বাসন তহবিল” নামে অভিহিত হইবে।’ যেসব খাতে এ তহবিলের অর্থ ব্যয় করার কথা হয়েছে সেই তালিকায় রয়েছে—জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য বা জুলাই যোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসন বা অনুরূপ ব্যয় নির্বাহ, জুলাই যোদ্ধাদের জন্য চিকিৎসা বাবদ বিশেষ আর্থিক সহায়তা বা অনুরূপ ব্যয় নির্বাহ এবং এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ।
এ আইনে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ এবং জুলাই যোদ্ধা কল্যাণ ও পুনর্বাসন তহবিল’ নামে কোনো তফসিলি ব্যাংকে একটি হিসাব থাকবে এবং এ তহবিলের সমুদয় অর্থ ওই হিসাবে জমা হবে।
১৮ জুন জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রোকেয়া বেগমের প্রশ্নের লিখিত জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও অংশগ্রহণকারী গেজেটভুক্ত ১৪ হাজার ৩৬৯ জন জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪৪ জনকে মাসিক সম্মানী ভাতা দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘১৪ হাজার ৩৬৯ জন গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪৪ জনের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে শ্রেণীভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে “ক” শ্রেণীর যোদ্ধারা মাসে ২০ হাজার টাকা, “খ” শ্রেণীর যোদ্ধারা ১৫ হাজার টাকা এবং “গ” শ্রেণীর যোদ্ধারা ১০ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। অবশিষ্টদের ভাতা প্রদান কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’