বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
আন্তর্জাতিক

আবার চালু হচ্ছে ডিভি লটারি, বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন

যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) বা গ্রিন কার্ড লটারি-২০২৭ চালু করতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা এই কর্মসূচির নিবন্ধন শিগগিরই শুরু হতে পারে। তবে বাংলাদেশিরা এবার এতে আবেদন করার সুযোগ পাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গত ১৪ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতের বিচারক ডিভি-২০২৭ কর্মসূচির নিবন্ধন চালু করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দ্রুত নিবন্ধনের সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন গ্রহণ করতে হবে।


ফোর্বসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ডিভি কর্মসূচির ২০২৭ সালের নিবন্ধন ২০২৫ সালের শেষ দিকে হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর এক ঘোষণায় মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন শুরুর তারিখ পরে জানানো হবে। তবে নির্বাচিতদের ভিসা আবেদনের সময়সীমা ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাখার কথা বলা হয়েছিল।


আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশের ফলে স্থগিত থাকা নিবন্ধন আবার চালুর পথ তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের আপিলের কারণে পরবর্তী সময়ে সময়সূচি বা কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে।

কেন ডিভি লটারি চালু হয়েছিল
যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি চালু হয় ১৯৯০ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রে যেসব দেশ থেকে তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ অভিবাসন করেন, সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অভিবাসন ব্যবস্থায় পরিবারের সদস্য বা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে অভিবাসনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ব্যবস্থায় যাদের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক বা পেশাগত যোগাযোগ রয়েছে, তারা তুলনামূলক সুবিধা পান। ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি সেই ব্যবস্থার বাইরে অপেক্ষাকৃত কম অভিবাসী পাঠানো দেশের নাগরিকদের জন্য একটি আলাদা সুযোগ তৈরি করে।

প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার ডাইভারসিটি ভিসা বরাদ্দ থাকে। তবে এই সংখ্যা পুরোপুরি মূল আবেদনকারীদের জন্য নয়। নির্বাচিত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানও ওই তালিকার আওতায় থাকেন। ফলে প্রতিবছর ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ডিভি আবেদনকারী হিসেবে নির্বাচিত হন—বিষয়টি এমন নয়।

কেন নিবন্ধন বন্ধ ছিল
২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সে কারণে নিবন্ধনের সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, পরিবর্তনগুলো ডিভি-২০২৭-এর নির্বাচিত ব্যক্তিদের ভিসা আবেদনের সময়সীমাকে প্রভাবিত করবে না।

কিন্তু দীর্ঘ সময় নিবন্ধন শুরু না হওয়ায় কর্মসূচিটির ২০২৭ সালের কার্যক্রম নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে রেড ঈগল ল নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠান ও আইনজীবী কার্টিস মরিসন সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন।

তাঁদের যুক্তি ছিল, নিবন্ধনের সুযোগ না খুললে আবেদনকারী থাকবে না, লটারি আয়োজন করা যাবে না এবং কার্যত ডিভি-২০২৭ কর্মসূচিই অকার্যকর হয়ে যাবে।

আদালত সেই যুক্তির সঙ্গে একমত হয়ে নিবন্ধন চালুর নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিবন্ধন-সংক্রান্ত ঘোষণা দিতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আবেদন গ্রহণ করতে হবে। নির্বাচিতদেরও পরে জানাতে হবে।

তবে আদালতের নির্দেশের পরও পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কারণ নিবন্ধন, লটারি, নির্বাচিতদের আবেদন এবং ভিসা প্রক্রিয়া—সব মিলিয়েই ডিভি কর্মসূচি সম্পন্ন হয়। নিবন্ধন জটিলতার কারণে পরবর্তী ধাপগুলো বিলম্বিত হলে নির্বাচিতদের জন্যও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

ডিভি লটারিতে নির্বাচিত হলেই কি গ্রিন কার্ড মেলে
না। ডিভি লটারিতে নির্বাচিত হওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার নিশ্চয়তা নয়।

নির্বাচিত হওয়ার পরও আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। প্রধান আবেদনকারীর কমপক্ষে উচ্চমাধ্যমিক সমমানের শিক্ষা থাকতে হবে অথবা নির্দিষ্ট কর্মঅভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এ ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট চাকরির অফার সাধারণভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, আগের অভিবাসন আইন লঙ্ঘনসহ অন্যান্য অযোগ্যতার বিষয় বিবেচনা করা হয়।

অর্থাৎ ডিভি লটারি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের জন্য আবেদন করার একটি সুযোগ তৈরি করে। লটারিতে নাম ওঠার পরও ভিসা পাওয়ার জন্য নির্ধারিত আইনি ও প্রশাসনিক শর্ত পূরণ করতে হয়।

বাংলাদেশিরা কি এবার আবেদন করতে পারবেন
বাংলাদেশিদের কাছে এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বর্তমানে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে ‘হ্যাঁ’ বলার সুযোগ নেই। কারণ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো ডিভি-২০২৭-এর দেশভিত্তিক যোগ্যতার তালিকা প্রকাশ করেনি। ফলে বাংলাদেশ এবার ডিভি লটারিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি।

আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন চালুর পথ তৈরি হলেও এতে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্য হয়ে যায়নি। কোন কোন দেশের নাগরিক এবার আবেদন করতে পারবেন, তা মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্পষ্ট হবে।

ফোর্বসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধন-সংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ২০২৭ সালের ডিভি কর্মসূচিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

কেন বাংলাদেশ ডিভি লটারিতে নেই
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচির জন্য অযোগ্য দেশগুলোর একটি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, আগের পাঁচ বছরে কোনো দেশ থেকে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে গেলে সেই দেশের নাগরিকেরা ডিভি কর্মসূচিতে আবেদন করার যোগ্য থাকেন না।

বাংলাদেশিরা সর্বশেষ ডিভি কর্মসূচিতে সুযোগ পেয়েছিলেন ২০১২ সালের দিকে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের সংখ্যা নির্ধারিত সীমার বেশি হওয়ায় বাংলাদেশকে ডিভি কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্যেও বাংলাদেশকে পরবর্তী বছরগুলোর ডিভি কর্মসূচির অযোগ্য দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিভি কর্মসূচির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অযোগ্য দেশগুলোর তালিকায় ছিল।

২০১৪ সালের ডিভি নির্দেশনাতেও বলা হয়েছিল, আগের পাঁচ বছরে ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসী পাঠানো দেশের নাগরিকেরা ওই কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন না এবং সে তালিকায় বাংলাদেশ ছিল।

তবে এই যোগ্যতা প্রতি বছর পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো দেশের অভিবাসন সংখ্যা নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে এলে পরবর্তী ডিভি কর্মসূচিতে সেই দেশের নাগরিকেরা আবার যোগ্য হতে পারেন।

এবার কী করবেন বাংলাদেশিরা
ডিভি-২০২৭ নিয়ে আদালতের নির্দেশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশিদের আবেদন করার সুযোগ ফিরে আসার নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এসব তথ্যকে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

বিশেষ করে ডিভি লটারির নামে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আবেদন, টাকা দাবি বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকি থাকে। তাই মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদন না করাই নিরাপদ।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের নির্দেশনাগুলোতেও ডিভি কর্মসূচির নিবন্ধন ও ফলাফল-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য সরকারি ওয়েবসাইট অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালত ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন চালুর নির্দেশ দিয়েছেন—কিন্তু বাংলাদেশিদের জন্য দরজা খুলেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। দেশভিত্তিক যোগ্যতার তালিকা প্রকাশের পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

তাই বাংলাদেশি আবেদনকারীদের আপাতত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ যদি ডিভি-২০২৭-এর যোগ্য দেশের তালিকায় ফিরে আসে, তখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করার সুযোগ তৈরি হবে। আর বাংলাদেশ আগের মতো অযোগ্য থাকলে আদালতের নির্দেশে ডিভি লটারি পুনরায় চালু হলেও বাংলাদেশিরা তাতে আবেদন করতে পারবেন না।

▐ এই সম্পর্কিত আরো