সুনামগঞ্জের শাল্লায় সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের জন্য সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে বসতঘর ও গাছপালা উচ্ছেদ করার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই তাদের বসতঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এতে আটটি পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
গত ৬ আগস্ট শাল্লা উপজেলার কালনীচর এলাকায় এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। হবিগঞ্জ সওজের নির্দেশনায় ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার রবিউর রায়হান। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে দুই থেকে তিন শতাধিক গাছপালাও কেটে বা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
উচ্ছেদে কালনীচরের আলকাছ আলী, আবু বক্কর, মোতালিব মিয়া, সুরুজ আলী, মিজানুর রহমান, মর্দু মিয়া, তফসীর আলম ও সোহাগ মিয়াসহ আটটি পরিবার সম্পূর্ণরূপে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, তাদের বসতভিটা সরকারি খাসজমিতে হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করে আসছেন তারা। সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ ও দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পের জন্য কালনী সেতু ও সড়ক নির্মাণে কালনীচরের ৩৭ জনের জমি অধিগ্রহণের কথা জানিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ওই নোটিশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা জানানো হয় বলেও দাবি তাদের।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, তাদের কোনো অর্থ পরিশোধ না করেই হঠাৎ করে বসতঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্যও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী সোহাগ মিয়া বলেন, ‘রাস্তার কাজে আমরা জায়গা ছাড়তে রাজি। কিন্তু সরকার আমাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল। জেলা প্রশাসকও এসেছিলেন। ক্ষতিপূরণ পাব—এমন চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। জিনিসপত্র সরানোর জন্য এক ঘণ্টা সময়ও দেওয়া হয়নি। এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।’
মৃত সুরুজ আলীর মেয়ে সুমনা আক্তার বলেন, ‘হঠাৎ প্রশাসনের লোকজন এসে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বলে। আমরা ঘরে থাকা চাল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরানোর জন্য সময় চাইলেও দেওয়া হয়নি। এখন খোলা আকাশের নিচে আছি। ভাত খাওয়ার জন্য একটি প্লেটও নেই। আমাদের সব শেষ।’
এ কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুমনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য এক ঘণ্টা সময় চাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী লুৎফর রহমানকে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে হাতকড়া পরানো হয়। পরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
লুৎফর রহমান বলেন, ‘রাস্তা হোক, আমরাও অবশ্যই চাই। তবে যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই।’
সুনামগঞ্জের অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান বলেন, সরকারি খাসজমিতে বসবাস করলেও কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কেউ সম্পূর্ণভাবে বাস্তুচ্যুত হলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার সুযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য, প্রকল্পের প্রত্যাশী সংস্থা অর্থাৎ রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা দেয়নি।
তিনি বলেন, নোটিশে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে কেন অর্থ দেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে—এই লাইনটি চিঠিতে ভুল করে লেখা হয়েছে।’
অন্যদিকে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে, হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, ‘সুনামগঞ্জের ডিসি অফিস থেকে যদি আমাদের কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হতো, তাহলে আইন অনুযায়ী আমরা দিয়ে দিতাম। কিন্তু তারা তো চায়নি। তারা যদি না চায়, তাহলে আমরা কী করব?’
তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ চেয়ে সওজকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি দেখতে হবে।
উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকারী সহকারী কমিশনার রবিউর রায়হান বলেন, ‘এডিসি রেভিনিউ স্যারের নির্দেশনায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি। এর বেশি কিছু জানি না।’
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে মেসার্স জন্মভূমি নির্মাতা ও জন-জেবী কনস্ট্রাকশন। ঠিকাদার ওয়াহিদুজ্জামান বাবুলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের রাস্তার কাজের দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কিছু জানি না। এগুলো রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে জানে।’
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের জায়গায় কিছু ঘরবাড়ি পড়েছিল। তাদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। তারা সরে না যাওয়ায় ঘরবাড়ি অপসারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের পক্ষ থেকে বন্দোবস্তসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, বিষয়টি রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের দেখার কথা। তবে সরকারি খাসজমিতে বসবাসকারীদের আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ নেই। পুনর্বাসনের জন্য জমি অধিগ্রহণের আগে প্রত্যাশী সংস্থাকে পরিকল্পনা দেওয়ার কথা থাকলেও রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে সে ধরনের কোনো পরিকল্পনা দেয়নি।
তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনা না দেওয়ায় তাদের পুনর্বাসনের জন্য রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের কাছে সেই পরিমাণ বরাদ্দও নেই। তারপরও আমরা রোডস অ্যান্ড হাইওয়েকে অনুরোধ করেছি। তারা গরিব মানুষ, দীর্ঘদিনের বসতবাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়টি যেন দেখা হয়। রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে জানিয়েছে, বিষয়টি তারা দেখবে।’
এদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ঘরবাড়ি উচ্ছেদ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুত পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছে।