হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে এক হাতুড়ে ডাক্তারের ভুল ও অপচিকিৎসায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তানহা বেগম (৯) নামে এক কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তবে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় মাত্র এক লাখ টাকায় আপস-মীমাংসার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত তানহা বেগম বানিয়াচং উপজেলার ৮নং খাগাউড়া ইউনিয়নের গুনই গ্রামের বাসিন্দা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তানহা নবীগঞ্জ উপজেলার কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের ইমামবাড়ি বাজারে তার নানা বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। গত ২৭ মে তার দাঁতের সমস্যা দেখা দিলে নানি খোসেদা খাতুন তাকে ইমামবাড়ি বাজারের একটি ফার্মেসিতে নিয়ে যান। সেখানে বড় আব্দা গ্রামের শরিফ উদ্দিনের ছেলে ও কথিত হাতুড়ে ডাক্তার সামসুদ্দিন কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তানহার একটি দাঁত উপড়ে ফেলেন।
অভিযোগ রয়েছে, দাঁত তোলার পর থেকেই তানহার মুখ দিয়ে অনবরত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রক্ত বন্ধ না হওয়ায় পরিবারের লোকজন পুনরায় ফার্মেসিতে গেলে অভিযুক্ত সামসুদ্দিনকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অন্য ফার্মেসি থেকে ওষুধ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে গা-ঢাকা দেন।
পরদিন ২৮ মে কিশোরীর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে তাকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে চারদিন চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা জানান, কিশোরীর অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তাকে জরুরি উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু চরম আর্থিক সংকটের কারণে দরিদ্র পরিবারটি তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয় এবং একপর্যায়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনে।
নিহতের নানি খোসেদা খাতুন জানান, দাঁত তোলার পর থেকেই তানহার মুখে খাবার গ্রহণ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। দিন দিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
এদিকে, তানহার মৃত্যুর পরপরই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠে একটি প্রভাবশালী মহল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৮নং খাগাউড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ মাসুদ কোরাইসি মক্কী অভিযুক্ত হাতুড়ে ডাক্তার সামসুদ্দিনকে সাথে নিয়ে নগদ এক লাখ টাকার বিনিময়ে পুরো বিষয়টি আপস-মীমাংসা করে দেন।
নিহতের মামা আলমগীর মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, "আমার ভাগনি মারা গেছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান মক্কী ভাই বিষয়টি আপসে মীমাংসা করে দিয়েছেন। তাই আমরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করেছি।"
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে খাগাউড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ মাসুদ কোরাইসি মক্কী বলেন, "আমি মৃত্যুর বিষয়টি শুনেছি। তবে কিভাবে ঘটনাটি শেষ হয়েছে বা আপস হয়েছে তা আমি কিছুই জানি না। খোঁজখবর নিয়ে পরে বক্তব্য দিতে পারব।"
অভিযুক্ত হাতুড়ে ডাক্তার সামসুদ্দিন মোবাইল ফোনে দাঁত তোলার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, "আমি যেদিন দাঁত তুলেছি সেদিন তো রোগী মারা যায়নি।" এরপর থেকেই তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোনায়েম মিয়া বলেন, "এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষ পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"