চা বাগানের একটি ছোট্ট ঘর। দরজায় বাইরে থেকে ঝুলছে তালা। অথচ ঘরটি ফাঁকা নয়। দরজার সরু ফাঁক গলে তাকালেই দেখা যায়- মাটিতে শুয়ে আছে একটি শিশু। কখনও হাত নড়ে, কখনও পা। শব্দ নেই, ভাষা নেই। তবু তার সামান্য নড়াচড়াই জানান দেয়- সে বেঁচে আছে। কালিটি চা বাগানের জংলি লাইনে এক দুপুরে গেলে চোখে পড়ে এমন এক দৃশ্যের।
শিশুটির নাম সোনালী তাঁতী। জন্ম থেকেই তীব্র সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত সে। বয়স যখন মাত্র আড়াই মাস, তখনই মা ঊষা তাঁতী মারা যান। সেই থেকে দাদী সনকা তাঁতীই তার মা, অভিভাবক ও একমাত্র আশ্রয়।
গত ১১ মার্চ ১১ বছর পূর্ণ হয় সোনালীর। কিন্তু তার পৃথিবী আজও সীমাবদ্ধ একটি ছোট্ট ঘর আর দাদীর কোলের ভেতর।
প্রায় এক দশক আগে স্বামী হারানো সনকা তাঁতী এখনও কোনো বিধবা ভাতা পাননি। চা বাগানে শ্রম বিক্রি করেই কোনো মতে টিকে আছে সংসার। প্রতিদিন ভোরে নাতনিকে খাওয়ানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা শেষে নিরুপায় হয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগান তিনি। কারণ তাকে দেখার মতো আর কেউ নেই। কাজ না করলে চুলায় আগুন জ্বলে না, আর তালা না দিলে শিশুটির নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নাতনিকে খাওয়ানো, স্নান করানো, কাপড় বদলানো সব দায়িত্বই এক হাতে সামলাতে হয় তাঁকে। আক্ষেপভরা কণ্ঠে দাদী সনকা বলেন, ‘নাতনিটারে যদি একটা হুইলচেয়ার দিতো কেউ, একটু সুবিধা হতো। টানাটানি করতে খুব কষ্ট হয়। শুনেছি এসব রোগীর জন্য বিশেষ কিছু যন্ত্র আছে। ভালো ডাক্তার দেখাইলে হয়তো একটু ভালো থাকতো। একা আমি আর কুলিয়ে উঠতে পারি না।’
সোনালীর বাবা রিন্টু তাঁতী কীর্তন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দ্বিতীয় বিয়ে করলেও নতুন স্ত্রী বাড়িতে খুব কম থাকেন। ফলে সোনালীর সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়েছে বৃদ্ধ দাদীর উপর।
স্থানীয় ইউপি সদস্য লছমী নারায়ণ অলমিক জানান, সোনালী প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকাভুক্ত হলেও বিকাশ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নিয়মিতভাবে সেই অর্থ তোলা যাচ্ছে না। সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
নেই স্কুল, নেই খেলার সাথী, নেই মুক্ত আকাশ। তার পৃথিবী এক দরজা, এক তালা আর এক ক্লান্ত দাদীকে ঘিরে। সোনালী এবং তার দাদীর গল্প শুধু একটি পরিবারের বেদনাকথা নয়। এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। এখন প্রয়োজন কেবল সহমর্মিতা নয়, দ্রুত ও কার্যকর মানবিক উদ্যোগ। সময়োচিত সহায়তা পেলে হয়তো তালাবদ্ধ এই শৈশবেও একটু আলো ঢুকতে পারে।