অতিবৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বোরো চাষিরা পড়েছেন চরম সংকটে। খলায় রাখা কাটা ধান শুকাতে না পেরে পচে যাচ্ছে, আর হাওরের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ফসল তলিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে। ফলে একদিকে ঘরে তোলা ধান রক্ষা, অন্যদিকে মাঠের ফসল কাটার লড়াই এই দ্বিমুখী চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
স্থানীয়রা জানান, টানা প্রায় ১০ দিনের বৃষ্টিতে খলায় রাখা ধান শুকানোর সুযোগ পাননি তারা। আগে কেটে রাখা ধান মাড়াই-ঝাড়াই করা যাচ্ছে না, আবার মাঠে থাকা পাকা ধানও পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খলায় স্তূপ করে রাখা ধানে ইতোমধ্যে শেকড় গজাতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় ভেজা থাকায় ধান পচে খড়ের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও জাঁক দেওয়া ধানের স্তূপে তাপ সৃষ্টি হয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এতে চালের রং, স্বাদ ও গন্ধ নষ্ট হয়ে মানবখাদ্যের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
সোমবার (৪ মে) দিনভর রোদ ওঠায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে পান কৃষকরা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা মিলে ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন।
বরাম হাওরের কৃষক আলী আহমদ বলেন, একটু রোদ উঠলেই সবাই কাজ শুরু করি। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নামলে আবার সব ভিজে যায়। খলা শুকাতে অনেক সময় লাগে, এরপর ধান বিছাতে হয়। এভাবে চেষ্টা করেও ধান বাঁচাতে পারছি না।
টাংনীর হাওরের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, মাঠের ধান কাটব, নাকি খলার ধান বাঁচাব কোনটা আগে করব বুঝতে পারছি না। পানি বাড়ছে, শ্রমিকও পাচ্ছি না। অনেক ধান চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, কষ্ট করে কেটে আনা ধানই এখন পচে যাচ্ছে। হাঁসের খামারিতে দিতে চাইলেও দাম খুব কম খরচই উঠছে না।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে দিরাই উপজেলার ৩৯টি হাওরে মোট ৩০ হাজার ১৭৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ১৩ হাজার ৮৮১ হেক্টর, উফশী ১৬ হাজার ২১৭ হেক্টর এবং স্থানীয় জাত ৮০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৭ মেট্রিক টন ধান।
কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি এবং ২৬ এপ্রিলের পর অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। কয়েকদিন টানা প্রতিকূল আবহাওয়ায় কৃষকরা হাওরে নামতেই পারেননি।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, জলাবদ্ধতা ও ঢলের কারণে হাওরের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিছু ধান কেটে আনা গেলেও শ্রমিক সংকট ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তার বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।