দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি খাতের বিকাশ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের একাংশের মতে, বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রশাসনিক ধীরগতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লাখেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে।
বাজেটে উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া শিল্পের কাঁচামালের ওপর উৎসে কর ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা, ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মাত্র ০.৫ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে কর ছাড়ের প্রস্তাবকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজেটে ভ্যাটের হার বৃদ্ধি না করে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কর-সুবিধা, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি করমুক্ত সীমা এবং স্বল্প পরিসরের ই-লোন চালুর পরিকল্পনাও বাজেটে স্থান পেয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটের বেশ কিছু পদক্ষেপ বিনিয়োগবান্ধব হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অনুমোদন, ছাড়পত্র এবং লাইসেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রিতা এখনো অন্যতম প্রধান সমস্যা।
বাজেটে ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে নিবন্ধন, অনুমোদন ও সরকারি সেবা প্রদানের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি সেবার আবেদন সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনো সিদ্ধান্ত না দিলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে।
এছাড়া কোম্পানির নামের ছাড়পত্র, নিবন্ধন আবেদন, ফি পরিশোধ ও সনদ প্রদান পুরোপুরি অনলাইনে সম্পন্ন করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রাথমিক অনলাইন অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারেন। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন সম্পন্ন করার সুযোগ থাকবে।
স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা সহজ করতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স সেবাকেও ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অতীতেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ, ভূমি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ একাধিক সংস্থার অনুমোদন নিতে গিয়ে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। এতে বিনিয়োগকারীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন এবং অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই স্থবির হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ী মহলের দাবি, ভূমি অফিস, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানি কমাতে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা নিয়মিত তদারকি না করলে বাজেটের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য শুধু কর-সুবিধা বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি স্থিতিশীল ও ভয়মুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, পুঁজিবাজার সংস্কার এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দিতে হবে।
তারা মনে করেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ঘোষিত বাজেটের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে। তবে এজন্য আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইউনূস সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব এখনো কাটেনি। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করছে, নতুন বাজেট বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে গত দেড় বছরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব। তাদের দাবি, ওই সময়ে বিনিয়োগ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা বন্ধ হয়ে যায় এবং বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
শিল্প মালিকদের সংগঠনের কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ থেকে বিরত ছিলেন। একই সঙ্গে ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি উৎপাদন খাতকে চাপে ফেলে।
তাদের মতে, নতুন সরকারের বাজেটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে আগে শিল্প ও ব্যবসা খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। অনেক উদ্যোক্তা এখনো বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মধ্যে রয়েছেন বলে তারা দাবি করেন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাজেটে ব্যবসা সহজীকরণে একাধিক উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, গ্যাস সংযোগ, ভূমি অফিস এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের অনুমোদন পেতে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এতে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো জরুরি। কর ছাড় বা প্রণোদনা ঘোষণার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, দ্রুত সেবা প্রদান এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।
তারা বলছেন, ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারকে একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক বাধা ও অতীতের অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে বিনিয়োগের গতি কমে যায় এবং শিল্পখাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাদের দাবি, উচ্চ সুদহার, নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা, বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সংকটের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্তমান সরকারের ঘোষিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সে সময় নেওয়া কিছু অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব এখনো ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যমান রয়েছে। তাদের মতে, নতুন বাজেটের সুফল পেতে হলে সেই সময়ের সৃষ্ট বিনিয়োগ-সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে হবে।