মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

জামালগঞ্জে ভারি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, কৃষকের আহাজারি

আট বিঘা জমি বর্গা নিয়ে এ বছর বোরো ধানের চাষ করেছিলেন ফেনারবাঁক ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের কৃষক শামসুদ্দিন। চার মাস ধরে ফসলের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করেছেন তিনি। যেখানে যত খরচ করার প্রয়োজন হয়েছে, সবই করেছেন।

কিন্তু সেই কষ্টের ফল এখন শূন্য হাতে পাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। ভান্ডা বিলের পাশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও টানা বৃষ্টিতে তার ধানের ফসল প্রায় তলিয়ে গেছে। তলিয়ে যাওয়া ধানের চারায় ইতোমধ্যে তোড় বের হচ্ছিল।

আর মাত্র ১৫-২০ দিনের মধ্যেই ধান কাটা যেত। সম্প্রতি টানা বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার পাগনা, ভান্ডা, চাকায়া, নলছুন্নী, ধানগইন্যা, ছন্না, শনি, মহালিয়া হাওরসহ প্রায় সব কটি হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর ৪৫ হাজার ৫শত৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে গত রোববার পর্যন্ত ১শত২৫ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। মোট ৫৬ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকেরা জানান, এ উপজেলায় প্রায় অর্ধশতাধিক ছোট-বড় বিল রয়েছে। এসব বিলের অধিকাংশেই বর্তমানে পানি জমে আছে।

হালির হাওরের কৃষক আব্দুস সালাম জানান, যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তাতে হাওরের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ জমি তলিয়ে গেছে। আবার বৃষ্টি হলে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এখনো আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসেও তেমন ভালো খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

পাগনার হাওরের কৃষক গিয়াস উদ্দিন জানান, পাগনার হাওরে আট বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। ধানের তোড় বের হওয়ার সময় জমি পানিতে ডুবে যায়। এখনো জমি পানির নিচে রয়েছে। দ্রুত পানি না সরালে ধানের চারা পচে নষ্ট হয়ে যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক জানান, জলাবদ্ধতার পেছনে মানবসৃষ্ট কারণও রয়েছে। বিভিন্ন নদীতে মাটি দিয়ে বাঁধ দিয়ে চলাচল ও মাছ ধরার জন্য বাঁধ দেওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। এতে হাওরের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর কানাইখালী খাল খননের নামে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ এলেও সঠিকভাবে কাজ হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, বালতি দিয়ে খাল খননের মতো দায়সারা কাজ করা হয়। আবার কোথাও এস্কাভেটর দিয়ে খনন করা হলেও খালের দুই পাড়ে ফেলা মাটি বৃষ্টিতে আবার খালে পড়ে যায়। ফলে খননের সুফল পাওয়া যায় না।

তার অভিযোগ, ফসল নষ্ট হয়ে কৃষকের সর্বনাশ হলেও কিছু অসাধু ব্যক্তি এ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করছেন। নির্বাচন এলে সবাই কানাইখালী খাল খননের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই তা আর বাস্তবায়ন হয় না।

তিনি বলেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির মতো একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ে কানাইখালী নদী প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ১০-১৫ ফুট গভীর করে খনন করা হলে হাওরের পানি দ্রুত নেমে যেত। এতে ফসল রক্ষা হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজননও বৃদ্ধি পেত।

ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল চন্দ্র তালুকদার বলেন, পাগনা, ভান্ডা ও চাকায়া হাওরে প্রায় তিনশ একর জমি অতিবৃষ্টির কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরের জমে থাকা পানি স্লুইস গেট দিয়ে বের হতে না পারায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে গজারিয়া স্লুইস গেটের আশপাশে খালে পড়ে থাকা মাটি পুনরায় খনন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাচনা বাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাসুক মিয়া বলেন, আমার ইউনিয়নের ছন্নার হাওরে প্রায় ১শত১২ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ হেক্টর জমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে এবং আরও প্রায় ৩০ হেক্টর জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে ১২টি পাম্প মেশিন দিয়ে দিনরাত পাঁচ দিন পানি নিষ্কাশন করা হলেও এক দিনের বৃষ্টিতে আবারও জমি তলিয়ে গেছে। দুর্লভপুর ছন্নার খাড়া খনন করে সেখানে একটি স্লুইস গেট স্থাপন করা গেলে হাওরের পানি দ্রুত নদীতে নেমে যাবে এবং কৃষকেরা সহজেই ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, এ উপজেলায় প্রায় ২৪ হাজার ৫শত৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ হেক্টর জমি ভারি বৃষ্টির কারণে নিমজ্জিত হয়েছে এবং আরও ১শত২৫ হেক্টর জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে বোরো ধান কাইচ তোড় পর্যায়ে রয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ, জমিতে ধানে ফুল তোড় পর্যায়ে এসেছে ৩৫শতাংশ,  প্রায় ৫ শতাংশ জমিতে দুধ পর্যায়ে রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ধান কাটা শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে হাওরের ফসল রক্ষা করতে হলে প্রতিটি হাওরের খাল  খনন করা অত্যন্ত জরুরি।

এই সম্পর্কিত আরো