আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী উত্তাপ। প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। রাত-বিরাত না মেনে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটে চলছেন তারা।
উঠান বৈঠক, পথসভা, গণসংযোগ ও কর্মীসভায় মুখর হয়ে উঠেছে গ্রাম থেকে পৌর এলাকা পর্যন্ত পুরো নির্বাচনী অঞ্চল। সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন আসন্ন নির্বাচন।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য ধানের শীষের প্রার্থী নাছির উদ্দীন চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনির এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট নিরঞ্জন দাশ খোকন। তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মূল লড়াই গড়ে উঠেছে নাছির উদ্দীন চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের মধ্যে।
রাজনৈতিকভাবে সচেতন এই আসনের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই এলাকার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। হাওরনির্ভর জনপদ, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, প্রবাসী অধ্যুষিত পরিবার এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমন্বয়ে গঠিত এই বিস্তীর্ণ আসনে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা তিন লাখের বেশি। এর মধ্যে নারী ও তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হওয়ায় ফলাফল নির্ধারণে এই শ্রেণির ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ধানের শীষের প্রার্থী নাছির উদ্দীন চৌধুরী এই আসনের পরিচিত মুখ। এর আগে তিনি দুইবার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও একবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদানের দাবি করছেন তিনি। প্রচারণায় তিনি ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং নতুন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। গণসংযোগকালে তিনি বলেন, “এই নির্বাচন শুধু এমপি নির্বাচনের বিষয় নয়, এটি মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম।”
অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনির সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সুশাসন, ন্যায়বিচার, নৈতিক রাজনীতি ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার তুলে ধরছেন। উঠান বৈঠক ও পথসভায় তিনি বলেন, “এলাকার মানুষ সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব চায়। কথা নয়, কাজের মাধ্যমেই সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই।”
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী অ্যাডভোকেট নিরঞ্জন দাশ খোকন সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালালেও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন।
নির্বাচনী মাঠে নাছির উদ্দীন চৌধুরী তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ও দলীয় সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছেন। বিপরীতে শিশির মনির শিক্ষিত, তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের লক্ষ্য করে নৈতিকতা ও আইনের শাসনের বার্তা দিচ্ছেন। ফেস্টুন, লিফলেটের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দুই পক্ষের প্রচারণা চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। শেষ মুহূর্তের প্রচারণা ও জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই আসনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে দিরাই-শাল্লার নির্বাচন রূপ নিয়েছে এক রুদ্ধশ্বাস দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অভিজ্ঞতা বনাম নতুন প্রত্যাশা এবং ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের লড়াইয়ের নিষ্পত্তি হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এখন অপেক্ষা শুধু ভোটের দিনের রায়ের।