হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বিখ্যাত প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ‘সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান’ থেকে আবারও বিপুল পরিমাণ শতবর্ষী সেগুনগাছ কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। বন বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে গত দুই-তিন দিনের ব্যবধানে রাতের আঁধারে বনের ভেতর থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
রবিবার (১৭ মে) সরেজমিনে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ডুমুরতলা এলাকায় গিয়ে বন উজাড়ের এক ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। বনের ভেতরে পড়ে আছে সদ্য কেটে নেওয়া বিশাল দুটি সেগুনগাছের মোটা গোড়া এবং চারপাশে ছড়িয়ে আছে করাতের গুঁড়া। সেখান থেকে আরও পূর্ব-দক্ষিণ দিকে গভীর অরণ্যে এগোলে একই আকারের আরও দুটি গাছ কাটা অবস্থায় দেখা যায়। প্রায় এক কিলোমিটার বনভূমি ঘুরে অসংখ্য কাটা গাছের তাজা গোড়া দৃশ্যমান হয়, যা বনের ভেতরে অবাধ গাছ চুরির নীরব সাক্ষ্য দিচ্ছে।
বনের ভেতরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪৫ বছর বয়সী স্থানীয় এক ভিলেজার আক্ষেপ করে বলেন, "শুধু গত দুই-তিন দিনেই বনের অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি বড় গাছ কাটা হয়েছে। পুরো বন ঘুরে দেখলে এমন অসংখ্য কাটা গাছের গোড়া পাওয়া যাবে। আগেও এভাবে গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে, যার পুরোনো শিকড় এখনও বনের ফাঁকে ফাঁকে পড়ে আছে।"
ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা প্রায় ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল। ২০০৫ সালে এটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। বিরল প্রজাতির উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়াহরিণ, বনরুইসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং শতবর্ষী সেগুন, গর্জন, চাপালিশ, করই গাছের কারণে এই বন অনন্য। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধভাবে গাছ কাটার ফলে বনটি এখন তার স্বাভাবিক রূপ ও পরিবেশগত ভারসাম্য হারাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই গাছ চুরির পেছনে দীর্ঘদিনের সক্রিয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। বনের ভেতর থেকে এত বড় বড় গাছ কেটে পাচার করার পেছনে কাঠচোরদের পাশাপাশি বন বিভাগের অসাধু কিছু কর্মচারী, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের পরোক্ষ যোগসাজশ রয়েছে।
পরিবেশবাদী নেতা তোফাজ্জল সোহেল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "একটি বড় গাছ কাটা মানে শুধু কাঠ হারানো নয়, এর সঙ্গে অসংখ্য বন্যপ্রাণী ও পাখির আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়। এভাবে গাছ কাটা চলতে থাকলে সাতছড়ির জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। বন ধ্বংসের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হবে এবং বিলুপ্ত হবে বন্যপ্রাণী। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় বনখেকো চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।"
গাছ চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে সাতছড়ি রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, "দুটি সেগুনগাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। জড়িতদের মধ্যে কয়েকজনকে পুলিশ কিছুটা শনাক্ত করতে পেরেছে।"
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, তিনি বর্তমানে একটি সরকারি প্রশিক্ষণে রয়েছেন এবং বিষয়টি তাঁকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে খোঁজ নিয়ে দ্রুত তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন, "সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের গাছ চুরির বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"