ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের মাঠে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রচার চলবে আগামী মাসের ১০ তারিখ সকাল পর্যন্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকে ভোটযুদ্ধে মাঠে নেমেছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। যেখানে মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। কিন্তু এরইমধ্যে আক্রমণ ও পাল্টা বক্তব্যে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছে দল তিনটির শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি যেমন অভিযোগের বিষে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চেয়েছে, তেমনি পাল্টা তোপ দেগেছে জামায়াত ও এনসিপি। গত বৃহস্পতিবার থেকে নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা।
ভোটের প্রচারের প্রথম দিন বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে নানা সমালোচনাও করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এক্ষত্রে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীকে নিশানা করেই বেশির ভাগ সমালোচনা করেছেন বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে ধানের শীষের এই প্রার্থী।
আসন্ন নির্বাচন ঘিরে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জামায়াতের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে একটি দল বেহেশতের টিকিট দেওয়ার কথা বলছে। তারা শুধু মানুষকে ঠকাচ্ছে না, যারা মুসলমান তাদের শিরকি করাচ্ছে; নাউজুবিল্লাহ। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত বিএনপির প্রথম নির্বাচনি জনসভায় এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে জনসভায় শ্রোতা হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তারেক রহমান প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কাবা শরিফে গেছেন, কাবা শরিফের মালিক কে?’ ওই ব্যক্তি উত্তর দেন, ‘আল্লাহ’।
অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে ঢাকা-১৫ আসনভিত্তিক বিশাল জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের জনসভায় বক্তব্যেও উঠে আসে তীব্র রাজনৈতিক ইঙ্গিত। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলাবাজি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস থেকে যারা নিজেদের কর্মীদের বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে একটি ভালো বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিবার ও কৃষক কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, খয়রাতি অনুদান নয়, বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে যুবসমাজকে সম্মানের সঙ্গে দেশ গড়ার কাজে যুক্ত করাই জামায়াতের মূল লক্ষ্য।
এ ছাড়া নির্বাচনি জনসভায় দেওয়া বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, উনি লন্ডনে গেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কিছুটা পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি হয়তো আছে। কিন্তু উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সৌজন্যতা, শিষ্টাচার বোধের জায়গা থেকেও এই কথা বলা যায় না।’
শুক্রবার খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের আরাফাত মহল্লায় নির্বাচনি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘কোনো একজন মুসলমান, যিনি আল্লাহ, রাসুল ও আখেরাতকে বিশ্বাস করেন, তিনি পরকালে বিশ্বাসী আরেকজনকে কাফের বলতে পারেন না, এটি জায়েজ নয়। তিনি এটা বড় অপরাধ করেছেন।’
এদিকে ভয় পেয়ে একটি বড় দল আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বলে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ১০ দলীয় জোটের গণজোয়ার দেখে একটি বড় দল ভয় পেয়েছে। তারা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গতকাল রাজধানীর ভাটারার বাঁশতলায় নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত গণমিছিলের আগে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, আগামী নির্বাচনে চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যুদের প্রতিহত করতে হবে। ঢাকা ১১ আসনে কোনো চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যুর স্থান হবে না।
এর আগের দিনও ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির প্রচারণার সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন নাহিদ ইসলাম। ওইদিন তিনি বলেন, আমরা শুনেছি ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। আমরা চাই কার্ড দেওয়া হোক, জনগণ সুবিধা পাক। এসময় প্রশ্ন রেখে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড জনগণ পর্যন্ত পৌঁছাবে তো? ২ হাজার টাকার কার্ড নিতে এক হাজার টাকার ঘুষ দেওয়া লাগবে না তো? যদি ঘুষ-চাঁদাবাজি নির্মূল না হয়, এসব সুযোগ-সুবিধা কি জনগণ পর্যন্ত পৌঁছাবে?
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে আদর্শ হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত ঢাকা-১৫ আসনের নির্বাচনি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের কার্যক্রমের এক ধরনের পুনরাবৃত্তি গত দেড় বছরে আরেকটি দলের কার্যক্রমে দেখা গেছে। গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে ঢাকা-১০ আসনের জামায়াত প্রার্থী জসীম উদ্দীন সরকার আয়োজিত তারুণ্যের উৎসব ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
তবে নির্বাচনি সমাবেশে রাজনীতিবিদদের এসব বক্তব্যের সঙ্গে ইঙ্গিতপূর্ণ সমালোচনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। যা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণার সময় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার যে রীতি, এটি ভোটের ময়দানে জনমত তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। কারণ অনেক সময় ভোটাররা মিথ্যাকেও সত্য মনে করে। দোষারোপের রাজনীতি দিয়ে মানুষের পেট ভরবে না। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করতে হবে। নির্বাচনের মাঠে প্রতিপক্ষকে নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু সেটা যেনো সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি না করে। সবাই একটা উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রত্যাশা করে।
তবে দোষারোপের রাজনীতি অনেক সময় আক্রমণাত্মক রাজনীতি হয়ে ওঠে; পরিবেশকে অনিরাপদ করে তোলে, এমনকি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে হত্যার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘দোষারোপের রাজনীতি’ টার্মটিকেই ‘রাজনৈতিক’ বলা হয় এবং তিনি মনে করেন, এ কথাটির কোনো গুরুত্ব গুরুত্ব নেই। কারণ ‘রাজনীতির খেলাটাই হলো শত্রু-মিত্র খেলা। এখানে আপনি আপনার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল না করতে পারলে আপনি দুর্বল হিসেবে প্রমাণিত হবেন। যেটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এই প্রচারণাকে কেন্দ্র করে যেন কেউ আহত-নিহত না হয়। যদি ভায়োলেন্স হয়, তাহলে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে’।