শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
জাতীয়

সেনা তহবিল লুট করে সাবেক ডিজিএফআই প্রধানের ‘সাবলাইম’ সাম্রাজ্য

বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অন্যতম কুশীলব প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ আইনের জালে ধরা পড়েছেন।

গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে জুলাই হত্যা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

সেনা কর্মকর্তাদের আমানত লুট ও জলসিঁড়ি কেলেঙ্কারি

সাধারণ সেনা অফিসাররা মামুন খালেদকে চেনেন তাদের অর্থ আত্মসাৎকারী হিসেবে। জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি দুর্নীতির বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ‘আশিয়ান সিটি’র মাধ্যমে ওই প্রজেক্টের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নজরুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। মামুন খালেদ সর্বমোট তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন আশিয়ান সিটির সঙ্গে। তার মধ্যে দুটি চুক্তি হয় ২০১১ সালের ২০ মার্চ। অন্যটি একই বছরের ২৫ মে। এসব চুক্তিতে তার সহযোগিতায় ছিলেন সাবেক কয়েকজন জুনিয়র অফিসার।

মামুন খালেদ প্রথম চুক্তিতে অফিসারদের জন্য তিন হাজার বিঘা জমি কেনার চুক্তি করলেও ওই দিনই তা পরিবর্তন করে ২ হাজার ২০০ বিঘার চুক্তি করেন। বাকি ৮০০ বিঘা জমি নজরুল ইসলাম এবং মামুন খালেদ ভাগাভাগি করে নিতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরে তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আবার তৃতীয় চুক্তি করেন, যেখানে শুধু ২ হাজার ২০০টি প্লটের কথা উল্লেখ আছে এবং অফিসারদের প্রত্যেককে পাঁচ কাঠা করে জমি দেওয়ার কথা আগে থাকলেও তিনি তাদের চার কাঠা করে দেওয়ার জন্য নতুন চুক্তি করেন। লাখ লাখ টাকা জমা দিলেও (নৌ ও বিমান বাহিনীর ৫ হাজার ১০৩ জন চাকরিরত, ৮৮৫ জন অবসরপ্রাপ্ত) হাজার হাজার সেনা কর্মকর্তার কয়েকশ কোটি টাকা লোকসান হয়। অফিসারদের জমা দেওয়া ১ হাজার ১ কোটি টাকারও বেশি দিয়ে তিনি নিজের শ্বশুর ও শ্যালকের নামে একাধিক কোম্পানি গড়ে তোলেন।

জানা গেছে, তিনি ‘সাবলাইম’ গ্রুপের অধীন সাবলাইম নেটওয়ার্ক, সাবলাইম আইটি, সাবলাইম বাংলাদেশসহ অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন লুটপাটের অর্থ দিয়ে। এছাড়া ‘গ্রিন রেড লিমিটেড’ নামে একটি ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে সরকারি বাসভবনকে ব্যবসার ঠিকানা বানিয়ে ২০০ কোটি টাকার ফ্লাইওভারের কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এর মধ্যে সাবলাইম নেটওয়ার্ক (রেজি. ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২), সাবলাইম আইটি (রেজি. ২৭ মার্চ ২০১২), সাবলাইম বাংলাদেশ (রেজি. ২৮ মার্চ ২০১৩), সাবলাইম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (রেজি. ১৯ ডিসেম্বর ২০১২), সাবলাইম বিজনেস (রেজি. ৮ ডিসেম্বর ২০১০), সাবলাইম রিসোর্স (রেজি. ৮ ডিসেম্বর ২০১০), সাবলাইম প্রোপার্টিজ (রেজি. ২৮ মার্চ ২০১১) উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ, সবগুলো কোম্পানি তিনি ডিজিএফআইয়ে থাকাকালীন প্রতিষ্ঠা করেন।

জানা গেছে, মামুন খালেদ জলসিঁড়ি প্রজেক্টের একটি খরচের তালিকায় বায়বীয় কিছু খরচের কথা উল্লেখ করেন। এতে দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের অর্থ দেওয়া বাবদ খরচ ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ফসলের ক্ষতি বাবদ ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, মিডিয়া ব্যবস্থাপনা বাবদ ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, অন্যান্য সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, পরিকাঠামো খরচ ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, স্থানীয় কর্মীদের বেতন ৪৮ লাখ টাকা, শান্তকরণের জন্য অর্থ পরিশোধ ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা—সব মিলিয়ে ৫২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা খরচ দেখান।

অভিযোগ রয়েছে, মামুন খালেদ ডিজিএফআইয়ের পরিচালক থাকাকালীন জলসিঁড়ি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন কিউএমজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে (সাবেক সেনাপ্রধান) নাজেহাল করার লক্ষ্যে রূপগঞ্জে স্থানীয় লোকদের দিয়ে ২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন, যার মাধ্যমে কিছু সেনাসদস্য স্থানীয়দের হাতে মার খান এবং স্থানীয় কিছু লোক নিহত হন। এর ফলে ওই প্রকল্প তখন কিছুটা স্থবির হয় এবং এ ব্যাপারে মামুন খালেদের চক্রান্তে সব দোষ তৎকালীন কিউএমজির ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়। ওই সুযোগকে ব্যবহার করে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কিছু সেনা কর্মকর্তার যোগসাজশে ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে চাকরিচ্যুত করার পরিকল্পনা করেন মামুন খালেদ। মামুন খালেদের চক্রান্ত তখন সফল হয়নি। তবে কিউএমজি ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে তখন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার আসামি খালেদ মামুনকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক কফিল উদ্দিন তার সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামি শেখ মামুন খালেদের নির্দেশে অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন ও নিপীড়নের জন্য দেশি অস্ত্রসহ বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে দেলোয়ার হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।

এই সম্পর্কিত আরো