দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলোর অন্যতম হলো মাঠ প্রশাসন। আর সে মাঠ প্রশাসনের বাস্তব চিত্র, সংকট, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় উঠে এসেছে সদ্য সমাপ্ত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে।
চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন তাই শুধু একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়, জবাবদিহি ও জনসেবার নতুন বার্তা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। এবারের সম্মেলনে প্রশাসনিক সক্ষমতা সংকট, রাজনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ডিজিটাল রূপান্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবারের ডিসি সম্মেলনে মোট ৩৪টি অধিবেশন ও কার্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং নির্দেশনা গ্রহণসহ আরো দুটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনা এবং বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, দুটি কমিশন (নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন) এবং ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অংশ নেয়। এবারের সম্মেলনে মোট ৪৯৮টি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে।
দেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনকে প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের অধীনে এটিই ছিল প্রথম ডিসি সম্মেলন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাঠ প্রশাসনকে জনগণের আস্থা অর্জন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দেন।
মাঠ প্রশাসনকে আরো গতিশীল, জনবান্ধব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পক্ষপাতমুক্ত থেকে দেশের স্বার্থে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালনের বিশেষ বার্তাও নিয়ে ফিরেছেন জেলা প্রশাসকরা।
জেলা প্রশাসকদের প্রধান চাহিদা
ডিসি সম্মেলনের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতা সংকট। জেলা প্রশাসকদের একটি বড় অংশ জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রশাসনিক দায়িত্ব বহুগুণ বেড়েছে, কিন্তু সে অনুপাতে জনবল, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়েনি।
বিশেষ করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এ কারণে তারা অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার নিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
ডিসিরা আরো বলেন, জেলার অনেক সরকারি অফিস এখনো পুরোনো কাঠামো ও সীমিত প্রযুক্তি নিয়ে চলছে। ফলে নাগরিক সেবা দ্রুত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই জেলা প্রশাসনকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কাঠামোয় রূপান্তরের দাবি এবারের সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ভূমি অফিসের ডিজিটাল রেকর্ড, অনলাইন নামজারি, জেলা পর্যায়ে সমন্বিত ডেটা সেন্টার এবং নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার চালুর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক চাপের প্রসঙ্গ
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বড় উদ্বেগের একটি ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা। কয়েকজন ডিসি বৈঠকে উল্লেখ করেন, জেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ তৈরি হয়। এতে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
বিশেষ করে অবৈধ দখল, নদীরক্ষা, বালু উত্তোলন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার মনিটরিংয়ের মতো কার্যক্রমে মাঠ প্রশাসনকে আরো আইনি ও নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এছাড়া সীমান্তবর্তী জেলার ডিসিরা চোরাচালান, মানবপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে বিশেষ নজরদারি ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
রাজস্ব আদায় ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোগ
সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়াতে জেলা প্রশাসকদের আরো সক্রিয় ভূমিকা দেওয়ার পরিকল্পনাও আলোচনায় উঠে আসে। নগদ লেনদেন কমিয়ে ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়ে ডিসিদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের কথাও আলোচনা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন অফিস ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পেমেন্ট নিশ্চিত করে কর ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়।
দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাড়তি বরাদ্দের দাবি
এবারের সম্মেলনে উপকূলীয় ও নদীভাঙনপ্রবণ জেলার প্রশাসকরা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানান। তারা বলেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও খরার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ব্যয়ের সক্ষমতা সীমিত।
অনেক ডিসি অভিযোগ করে জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। তাই জেলা প্রশাসকদের জন্য দ্রুত ব্যয়যোগ্য জরুরি প্রতিক্রিয়া তহবিল গঠনের প্রস্তাব গুরুত্ব পেয়েছে।
সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘জনবান্ধব প্রশাসন’ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া। সরকারের পক্ষ থেকে ডিসিদের বলা হয়েছে, জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে সরাসরি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ পর্যবেক্ষণ, দ্রুত প্রতিকার এবং সেবায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ডিসি সম্মেলন স্পষ্ট করেছে যে, মাঠ প্রশাসন এখন শুধু সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের যন্ত্র নয়, বরং উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম প্রধান শক্তি। তবে বাস্তবতা হলো—জেলা প্রশাসকদের চাহিদার বড় অংশ দীর্ঘদিনের। অতীতেও অনেক প্রস্তাব উঠেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এবারের সম্মেলনের সফলতা নির্ভর করবে কত দ্রুত এসব প্রস্তাব বাস্তবে রূপ পায় তার ওপর।
সম্মেলনে উপস্থিত থাকা বগুড়া জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তৌফিকুর রহমান আমার দেশকে বলেন, আমার দিক থেকে বগুড়ায় বিমানবন্দর আধুনিকায়নের করার কথা তুলে ধরেছি। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রশিক্ষণের বিষয় নিয়ে কথা বলেছি।
সব ডিসির পক্ষ থেকে কমন প্রস্তাবের বিষয়ে বগুড়ার ডিসি আরো বলেন, আমাদের বিভিন্ন দুর্যোগে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটার পাশাপাশি থোক বরাদ্দ থেকে নগদ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে করে দুর্যোগের সময় তাৎক্ষণিক ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করা যাবে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ বার্তা দিয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ভারত থেকে গরু পাচার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, র্যাব-বিজিবির সঙ্গে আমাদের মিটিং হয়েছে। বাইরের গরু কোনোভাবেই দেশে ঢোকার সুযোগ নেই। জেলার প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে জানানো হয়, এবার কোরবানির পশুর চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি আছে।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও সুশাসনের কর্মী আবদুল আউয়াল মজুমদার আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের সম্মেলন জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সরকারপ্রধানের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়। এছাড়া জেলা প্রশাসকদের মধ্যেও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি করে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মনোবল বাড়াতে এবং সমস্যা জানাতে ডিসি সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি আরো বলেন, সুশাসনের ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো, স্থানীয় এমপিদের হস্তক্ষেপ। তিনি বলেন, যদি এমপিদের হস্তক্ষেপ সীমিত থাকে এবং জেলা প্রশাসকের সততা ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, তাহলে জনগণের জন্য ভালো কাজ করা সম্ভব।